“তৃণমূলের প্রার্থী হতে জন্মাইনি, প্রার্থী না হলে মরে যাব না”- বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে মনোরঞ্জন ব্যাপারী

বলাগড়ের তৃণমূল বিধায়ক এবং বিশিষ্ট লেখক মনোরঞ্জন ব্যাপারী নিজেকে আন্দোলনের কর্মী হিসেবে দেখেন। আসন্ন ভোটে দল টিকিট না দিলেও তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ তিনি মানুষের জন্য কাজ করে যেতে চান। সম্প্রতি ইটিভি ভারতের প্রতিনিধি পলাশ মুখোপাধ্যায়কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, দুর্নীতির অভিযোগ এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট উত্তর দিয়েছেন।

‘বহিরাগত’ বিতর্ক ও বিজেপি-কে জবাব
ইটিভি ভারত: আপনাকে বারবার বহিরাগত বলা হয়েছে, তৃণমূলের অন্দরেও দ্বন্দ্ব তৈরির চেষ্টা হয়েছে—এ বিষয়ে আপনার মতামত কী? মনোরঞ্জন ব্যাপারী: বেশিরভাগটাই বিজেপির তরফ থেকে আমাকে ‘বহিরাগত’ বলা হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি গুজরাতের বাসিন্দা হয়ে বারাণসী থেকে লোকসভার প্রার্থী হলে তিনি বহিরাগত নন? আমি বৈধভাবে ভারতে বসবাসকারী। আমার বাবা দণ্ডকারণ্যে পুনর্বাসন প্রাপ্ত রিফিউজি। আমি মঙ্গল গ্রহ থেকে আসিনি। আমি নির্বাচন কমিশনের নিয়ম মেনে ভোটে লড়েছি এবং মানুষের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। বিজেপির কিছু দালাল এসব বলতে পারে, তাতে আমার কিছু এসে যায় না।

দুর্নীতি, শান্তনু-কুন্তল ও ভোটের প্রভাব
ইটিভি ভারত: তৃণমূলের বিরুদ্ধে চাকরি থেকে বালি, মাটি চুরি-সহ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে বলাগড়ের শান্তনু ও কুন্তলও ছিল। ভোটে এর প্রভাব পড়বে কি? মনোরঞ্জন ব্যাপারী: অভিযোগ যে কেউ, যে কারও বিরুদ্ধে তুলতে পারে। বিচার ব্যবস্থা তাঁর অপরাধ প্রমাণ করে তাঁকে সাজা দেবে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত না হলে জামিন তো পাবেনই। শান্তনু-কুন্তলদের নিয়ে বলাগড়ের ভোটে কোনও প্রভাব পড়বে না।

বিধায়ক হিসেবে সফলতা ও সন্তুষ্টি
ইটিভি ভারত: লেখক থেকে রাজনৈতিক নেতা – পাঁচ বছর বিধায়ক হিসাবে কাজ করে আপনি কতটা সন্তুষ্ট? মনোরঞ্জন ব্যাপারী: বিধায়ক হিসেবে আমি কতটা সফল হয়েছি, সেটা মানুষ বলবে। তবে, আমি আমার কাজে কোনওদিন ফাঁকি দিইনি, সততার সঙ্গে কাজ করেছি। আমি আমার সাধ্যমতো সেবা ও পরিষেবা দিয়েছি। আমার কাজ নিয়ে আমি সন্তুষ্ট।

গঙ্গা ভাঙন ও কেন্দ্রের ভূমিকা
ইটিভি ভারত: বলাগড়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু গঙ্গা নদীর ভাঙন। ভাঙন রোধে রাজ্য বা কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে আপনার কী মত? মনোরঞ্জন ব্যাপারী: গঙ্গা ভাঙন একটা বড় ইস্যু, এর সমাধানে হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। রাজ্য সরকার বারবার কেন্দ্রের কাছে দরবার করলেও কেন্দ্রীয় সরকার এই বিষয়ে কোনও চিন্তাভাবনা করছে বলে জানা নেই। কেন্দ্রীয় সরকার মানবিক হলে এগিয়ে এসে গঙ্গাপারের মানুষগুলোর জন্য কিছু করত।

রাজ্যের সীমাবদ্ধতা: রাজ্য সরকারের ক্ষমতা সীমিত। কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের প্রাপ্য আবাস যোজনা, একশো দিনের বকেয়া প্রায় তিন লক্ষ কোটি টাকা দিচ্ছে না। রাজ্যের ভাণ্ডারে টাকা না-থাকলে সে কী করবে!

সমাধান: সামান্য পয়সায় ভাঙন রোধ সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।

কুটির শিল্প ও ইটভাটা অর্থনীতি
ইটিভি ভারত: বলাগড়ে নৌকা তৈরি, প্লাস্টিক ফুল তৈরির মতো কুটির শিল্প রয়েছে। এই শিল্পগুলি নিয়ে কী করেছেন? মনোরঞ্জন ব্যাপারী: ক্ষুদ্র শিল্প নিয়ে রাজ্য সরকারের তরফে যেটুকু সহযোগিতা করা দরকার, সে সবই হয়েছে।

ইটিভি ভারত: বালি-মাটি চুরি কি রোখা গিয়েছে? মনোরঞ্জন ব্যাপারী: ব্যাপক আকারে যে চুরি চলছিল, তাতে রাশ টানা গিয়েছে। তারা এখন সরকারি রয়্যালটি দিয়ে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। বলাগড়ে ৪৮টি ইটভাটা রয়েছে, যা এলাকার অর্থনীতি সচল রাখছে। মাটি তুলতে হবে, ইটভাটাকে সচল রাখতে হবে, কিন্তু অবৈধভাবে যেন মাটি কাটা না হয়—আমরা সেটা দেখছি।

ভোটার তালিকা ও ‘বাঙালির উপর আক্রমণ’
ইটিভি ভারত: এসআইআর প্রক্রিয়ায় বহু ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে বলে মানুষ আতঙ্কিত। আপনার বক্তব্য কী? মনোরঞ্জন ব্যাপারী: এসআইআর-এর উদ্দেশ্য মৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া। কিন্তু এখানে নথি নিয়ে একটা বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা চলছে। কাউকে কাউকে বাংলাদেশের সীমান্ত পার করে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কেন? শুধু বাঙালির উপর এই আক্রমণ বাংলা ছাড়া অন্য রাজ্যেও হচ্ছে।

ইটিভি ভারত: অনেকে স্বীকার করেছেন অবৈধভাবে ভারতে ঢুকেছিলেন। আপনার কী মনে হয়? মনোরঞ্জন ব্যাপারী: প্রথম কথা, বিএসএফ কার হাতে? কেন্দ্রীয় সরকার কী করছে? যখন কেউ স্বীকার করছেন, তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করা হোক। ভোটের সময় এই ইস্যুগুলি তোলার কারণ কী? সারা পৃথিবীতে ১৬ লক্ষ রোহিঙ্গা রয়েছে, তাহলে বলা হচ্ছে বাংলায় এক কোটি কুড়ি লক্ষ রোহিঙ্গা আছে কেন? এই মিথ্যাচার কেন?

রাজনীতি নাকি সাহিত্য?
ইটিভি ভারত: আগামী দিনে কী করবেন, রাজনীতিতে থাকবেন, না লেখালিখিতে নিজেকে ব্যস্ত রাখবেন? মনোরঞ্জন ব্যাপারী: লেখালিখি ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। আমি মানুষের পাশে আছি, মানুষের কাছে আছি। বিধায়ক না থাকলেও আমি মানুষের কাজ করেছি।

ইটিভি ভারত: তৃণমূল যদি আপনাকে ফের প্রার্থী না করে, তাহলে কী করবেন? মনোরঞ্জন ব্যাপারী: তৃণমূলের প্রার্থী হওয়ার জন্য আমি জন্মাইনি, প্রার্থী না হলে আমি মরে যাব না। আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একজন অনুগত সৈনিক। প্রার্থী না করলে অন্য কাজ দেবেন। মানুষের কাজ করতে গেলে বিধায়ক হতেই হবে, এমন কোনও কথা নেই। আমি দলিত সাহিত্য-অ্যাকাডেমির চেয়ারম্যান, সেই কাজ করব।

ইটিভি ভারত: আগামী দিনে তৃণমূলেই থাকবেন? মনোরঞ্জন ব্যাপারী: বিজেপি ভারতের মেহনতি, দলিত, সংখ্যালঘু, আদিবাসী, মহিলাদের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকারক একটি দল। এই দলটিকে একমাত্র মাননীয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রুখে দিতে পারেন। বিজেপিকে আটকানোর জন্য তৃণমূল ছাড়া আর কোনও দলের উপর ভরসা করা যায় না।