আমেরিকার মিত্র থেকে চিরশত্রু! কীভাবে বদলে গেল ইরান-মার্কিন সমীকরণ?

আজ ইরান এবং আমেরিকাকে বিশ্বের অন্যতম ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা যায়। উভয় দেশই যেন একে অপরের রক্তচক্ষুর জবাব দিতে সদা প্রস্তুত। বর্তমান সময়ে প্রতিদিন ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সংঘাতের খবর শিরোনামে আসে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র সামনে আসে। একসময় এই দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং সহযোগিতামূলক। ১৯৫০-এর দশক থেকে ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক বিপ্লব পর্যন্ত সময়কালকে মার্কিন-ইরান সম্পর্কের ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
যে ইরান আজ আমেরিকার বিরুদ্ধে নিয়মিত বিষোদগার করে, কিংবা যে আমেরিকা ইরানকে কঠোর নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত করতে চায়, তারা এককালে হাত ধরাধরি করে বন্ধুত্বের জয়গান গাইত। সে সময় ইরান ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একনিষ্ঠ মিত্র, যেখানে আধুনিকতার রমরমা ছাপ স্পষ্ট ছিল। ইরানের তেল সংঘাতের প্রধান উৎস ছিল না, বরং তা ছিল দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি। ইরানি মুদ্রায় প্রচুর পরিমাণে মার্কিন পণ্যও কেনা হতো, যার ফলে দুই দেশই সমানভাবে লাভবান হয়েছিল।
১৯৫৩ সালে ইরানে ক্ষমতার পালাবদলের পর শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়ে ওঠেন। মার্কিন প্রশাসন ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ মনে করত। ১৯৫৫ সালে দুই দেশের মধ্যে মৈত্রী, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক অধিকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা স্থায়ী শান্তি ও বন্ধুত্বের অঙ্গীকার করে। তেল ছিল এই সম্পর্কের প্রধান মেরুদণ্ড। ১৯৫৪ সালের নতুন তেল চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে ইরানের তেল উৎপাদনের একটি বড় অংশ দেওয়া হয়। এর ফলে ইরান পশ্চিমা বিশ্বের কাছে অন্যতম প্রধান ও নির্ভরযোগ্য তেল সরবরাহকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৯৭০-এর দশকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আকস্মিক বৃদ্ধি পেলে ইরানের কোষাগারে প্রচুর অর্থ জমা হতে শুরু করে। এই আয়ের বড় একটি অংশ আমেরিকান আধুনিক প্রযুক্তি, ভারী যন্ত্রপাতি ও ব্যয়বহুল অস্ত্রশস্ত্র ক্রয়ে ব্যয় করা হতো।
১৯৭০-এর দশকে ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতার স্থান দখল করে নেয়। শাহ শত শত কোটি ডলার ব্যয়ে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম কেনেন। এফ-১৪ এর মতো বিশ্বখ্যাত যুদ্ধবিমান ক্রয়ের বহু ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানিগুলো ইরানে অবাধে বিনিয়োগ ও যৌথ প্রকল্পের সুযোগ পায়। ব্যাংকিং, নির্মাণ, কৃষি এবং শিল্প ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা নজিরবিহীনভাবে প্রসার লাভ করে। শুধু তাই নয়, বিপুলসংখ্যক ইরানি শিক্ষার্থী আমেরিকার নামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যেত, যার মাধ্যমে প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও সংস্কৃতির ব্যাপক আদান-প্রদান ঘটেছিল। ইরানের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল অন্যতম প্রধান অংশীদার।
তবে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব সবকিছু আমূল বদলে দেয়। মার্কিন-সমর্থিত শাহ ক্ষমতাচ্যুত হন, তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকট তৈরি হয় এবং দীর্ঘদিনের মৈত্রী চিরতরে বৈরিতায় রূপ নেয়। এরপর শুরু হয় অন্তহীন নিষেধাজ্ঞার করুণ অধ্যায়। আজকের এই চরম উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অতীতের সেই সোনালী দিনগুলোর কথা স্মরণ করা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যখন ইরান ও আমেরিকা কেবল রাজনৈতিক মিত্রই ছিল না, বরং শিক্ষা, বাণিজ্য, তেল ও অস্ত্রের দুনিয়ায় ছিল একে অপরের গভীর অংশীদার।