“তদন্তে গড়িমসি করছেন কেন?” অভিষেক-ঘনিষ্ঠের মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে একহাত নিল সর্বোচ্চ আদালত!

রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ আপ্ত-সহায়ক সুমিত রায় (Sumit Roy)-কে কেন্দ্র করে আইনি লড়াই ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সোমবার সুমিত রায়ের একটি মামলার আগাম জামিনের আবেদন নিয়ে শুনানি শুরু হয় দেশের সর্বোচ্চ আদালতে। আর সেই শুনানির শুরুতেই তদন্তের শ্লথ গতি এবং গড়িমসি করার অভিযোগ তুলে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-সহ কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হয় প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের কাছে। একই সঙ্গে শুনানিতে উঠে আসে বহুল আলোচিত ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্স’ (Leaps and Bounds) সংস্থার প্রসঙ্গও।
সোমবার ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বিশেষ বেঞ্চে সুমিত রায়ের এই মামলার শুনানি চলছিল। শুনানির সময় আদালতের মুখোমুখি হয়ে কেন্দ্রীয় এজেন্সির পক্ষে সওয়াল করেন দেশের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তিনি দাবি করেন যে, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অ্যাকাউন্ট থেকে ৩০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্স’-এর মতো বিতর্কিত সংস্থার অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়েছে। এই বিস্ফোরক অভিযোগের পরেই কেন্দ্রীয় এজেন্সির কার্যপদ্ধতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী।
এদিন বিচারপতি সুনির্দিষ্টভাবে ভর্ৎসনা করে বলেন, “লিপস অ্যান্ড বাউন্স’-এর প্রসঙ্গ যত কম টানা যায় ততই আপনাদের তদন্তকারী সংস্থার জন্য ভালো। কারণ, তদন্তকারী সংস্থা বরাবরই ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্স’-এর মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে চরম গড়িমসি ও ঢিলেঢামি দেখিয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টের একের পর এক বিচারক এই বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে একাধিক কঠোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু অভিযুক্তদের হেফাজতে নিয়ে জেরা করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় এজেন্সির কখনই কোনো প্রকৃত সদিচ্ছা দেখা যায়নি। তদন্তের গতিপ্রকৃতি দেখে মনে হয়, এজেন্সি কখনও অদ্ভুতভাবে শ্লথ হয়ে পড়ে, আবার কখনও প্রয়োজন ফুরোলে বা রাজনৈতিক স্বার্থে হঠাৎ করেই অতি তৎপর হয়ে ওঠে। অথচ তদন্ত প্রক্রিয়ায় সবসময় একটি নিখাদ নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছতা বজায় থাকা অত্যন্ত বাধ্যতামূলক।”
আদালতে সুমিত রায়ের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে তাঁর আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণ তীব্র অভিযোগ করেন যে, জেরার নামে তাঁর মক্কেলকে টানা এগারো দিন ধরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু মূল অভিযোগের বিষয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কোনো প্রশ্ন তাঁকে একবারও করা হয়নি। পুরো জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়াটি সিসিটিভি বা ভিডিয়োগ্রাফি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আইজীবীর এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা পালটা সওয়াল করেন যে, সুমিত রায়কে সমস্ত প্রাসঙ্গিক এবং প্রয়োজনীয় প্রশ্নই করা হয়েছে এবং সেই সমস্ত দাবির অকাট্য প্রমাণ তাঁদের কাছে সুরক্ষিত আছে। তিনি আরও জানান যে, এই প্রমাণগুলি খুব শীঘ্রই সিলমোহরবন্দি খামে আদালতে জমা দেওয়া হবে। সলিসিটর জেনারেলের দাবি, প্রাথমিক তদন্তে ১০ লক্ষ টাকার জালিয়াতির সন্ধান মিললেও এটি আসলে প্রকাণ্ড ‘হিমশৈলের চূড়া মাত্র’। বিপুল পরিমাণ নগদ কালো টাকা অন্য কোনো নিরাপদ জায়গায় লুকানো রয়েছে এবং সম্প্রতি আরও দু’কোটি টাকা অন্যত্র সরানোর প্রমাণ মিলেছে। উভয় পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পর আদালত এই মামলার জিজ্ঞাসাবাদের সমস্ত লিখিত ট্রান্সক্রিপ্ট বা প্রতিলিপি জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আগামী সোমবার এই মামলার পরবর্তী দফার গুরুত্বপূর্ণ শুনানি ধার্য করা হয়েছে।