জন্তর মন্তরে রণক্ষেত্র! পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে সংসদ অভিযানের চেষ্টা ককরোচ জনতা পার্টির, উত্তাল জাতীয় রাজধানী

সোমবার সংসদের বাদল অধিবেশন শুরুর প্রাক্কালে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র ডাকে আয়োজিত ‘চলো সংসদ’ অভিযানকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তর ও তার পার্শ্ববর্তী চত্বর এক প্রকার রণক্ষেত্রের রূপ নেয়। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী শত শত প্রতিবাদী ও ছাত্র-যুবক একত্রিত হয়ে যখন সংসদ ভবনের দিকে জোরকদমে এগোনোর চেষ্টা করেন, তখনই পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ব্যারিকেড ও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের বাধা দেয়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে মৃদু লাঠিচার্জ করতে হয়। এই আকস্মিক সংঘাত ও পুলিশি কড়াকড়ির জেরে রাজধানীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা এবং সংযোগকারী পথগুলিতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, যার ফলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

ক্রমশ ঘনীভূত হওয়া এই উত্তেজনার মাঝেই পরিস্থিতি সামাল দিতে আসরে নামে প্রশাসন। পুলিশি সংঘর্ষের পর ককরোচ জনতা পার্টির প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাসকে ডেপুটি কমিশনারের (DC) অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকেই তিনি বিশিষ্ট সংবাদসংস্থা এএনআই-কে (ANI)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান যে, প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে তাঁদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসনের এই উদ্যোগ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে সৌরভ দাস অভিযোগ করেন যে, আলোচনার কথা মুখে বলা হলেও প্রশাসনের তরফে কোনো স্পষ্ট রূপরেখা বা সুনির্দিষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে না। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, “বল এখন পুরোপুরি ওদের কোর্টেই রয়েছে।”

উল্লেখ্য, এদিন থেকে শুরু হওয়া সংসদের বর্ষাকালীন বা বাদল অধিবেশনকে সামনে রেখে গোটা দিল্লি জুড়েই আগে থেকেই সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জারি করা হয়েছিল। দিল্লি পুলিশের কঠোর নির্দেশিকা অনুযায়ী, নতুন দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (BNSS) ১৬৩ ধারা বলবৎ করা হয়েছে, যা পূর্বে ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ১৪৪ ধারা হিসেবে পরিচিত ছিল। এই আইনি বিধিনিষেধের জেরে যন্তর মন্তরের নির্ধারিত নির্দিষ্ট স্থানটি ছাড়া অন্য কোথাও পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত, মিছিল বা বিক্ষোভ প্রদর্শনের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পুলিশের সাফ বক্তব্য, ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ তিপকে এবং অন্যান্য বিশিষ্ট সমাজকর্মীদের নেতৃত্বে আয়োজিত এই সংসদ অভিযানের জন্য আয়োজকদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্রশাসনিক অনুমতি নেওয়া হয়নি। নিয়ম অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) ২২৩ ধারা এবং অন্যান্য কঠোর আইনি বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কড়া হুঁশিয়ারি আগেই দিয়েছিল দিল্লি পুলিশ।

এই সার্বিক উত্তেজনার মধ্যেই আরেকটি বড় রাজনৈতিক ও মানবিক কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিশিষ্ট সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলন। শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতির জেরে গত শনিবার সকালেই তাঁকে জোর করে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থেকেও তাঁর অনশন আন্দোলন থামেনি। সোমবার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’ (X)-এ নিজের হাতে লেখা একটি দীর্ঘ পোস্টে তিনি নিজের অনশন ভাঙার তিনটি সুনির্দিষ্ট শর্তের কথা স্পষ্ট করে জানান। তাঁর শর্তগুলি হলো— প্রথমত, কেন্দ্রীয় সরকারকে দেশের ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থার সাম্প্রতিক ব্যর্থতা ও ব্যাপক প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় প্রকাশ্যে স্বীকার করতে হবে; দ্বিতীয়ত, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাংসদদের সংসদের অন্দরে এই শিক্ষা সংস্কারের বিষয়টি নিয়ে জোরালো আলোচনার আশ্বাস দিতে হবে; এবং তৃতীয়ত, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি যদি নিজে সংসদে যেতে না পারেন, তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংসদদের সশরীরে হাসপাতালে এসে তাঁকে এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দিতে হবে।

সোনম ওয়াংচুক আরও অভিযোগ করেছেন যে, সফদরজং হাসপাতালে তাঁকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে আটকে রাখা হয়েছে এবং তাঁর স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও বাইরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সমস্ত অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, এই পরিস্থিতিতে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো সমগ্র আন্দোলনকারী ও দেশবাসীর উদ্দেশে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। তিনি সংবাদসংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো অবস্থাতেই যেন মূল আন্দোলন এবং শিক্ষার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জরুরি বিষয় থেকে কারো ফোকাস সরে না যায়। সকলের প্রতি তাঁর কড়া সতর্কবার্তা ছিল যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো মূল্যে শান্তিপূর্ণভাবে এই প্রতিবাদ জারি রাখতে হবে এবং বিভ্রান্তি এড়িয়ে নিজেদের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে।