জগন্নাথের সেবায় রাজা এখন ‘ঝাড়ুদার’! রথযাত্রার এই পবিত্র রীতিতে লুকিয়ে আছে জীবনের বড় শিক্ষা

পুরীর রথযাত্রা বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে জনসমুদ্র আর বিশাল সব রথের দৃশ্য। কিন্তু রথের রশি টানার আগে বড়দাণ্ডায় যে দৃশ্যটি মঞ্চস্থ হয়, তা প্রতিটি ভক্তের হৃদয়ে শিহরণ জাগায়। রথযাত্রার দিন পুরীর গজপতি মহারাজ, যিনি ঐতিহ্যগতভাবে ওই রাজ্যের অধিপতি, তিনি হাতে তুলে নেন একটি সোনার তৈরি ঝাঁটা। এরপর জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার রথের সামনের পথ তিনি নিজে ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করেন। শঙ্খধ্বনি, ঢাকের বাদ্যি আর লক্ষ ভক্তের “জয় জগন্নাথ” ধ্বনিতে মুখরিত সেই পরিবেশে এই আচারটি “ছেরা পহরা” নামে পরিচিত।

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, ঝাড়ু দেওয়ার জন্য তো বাঁশের বা কাঠের ঝাঁটাই যথেষ্ট। রাজা যখন দামী ধাতু ব্যবহার করছেনই, তখন রুপো বা তামা হতে পারত। কিন্তু কেন একমাত্র সোনাকেই বেছে নেওয়া হলো? এর পেছনে লুকিয়ে আছে তিনটি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ।

প্রথম কারণটি হলো অহংকার ত্যাগ এবং অসীম ভক্তি। পুরীর রাজা নিজেকে কখনো শাসক মনে করেন না। তিনি নিজেকে “জগন্নাথের দাসানুদাস” বা দাসের দাস হিসেবেই গণ্য করেন। সোনা ঐশ্বর্যের প্রতীক, আর ঝাঁটা হলো সেবার প্রতীক। রাজা সোনার ঝাঁটা হাতে নিয়ে সমগ্র বিশ্বকে এই বার্তা দেন যে, তাঁর রাজমুকুট, ক্ষমতা ও ঐশ্বর্য—সবই ঈশ্বরের চরণে তুচ্ছ। তিনি প্রমাণ করেন, প্রভুর সেবার সামনে রাজা-প্রজার ভেদাভেদ নেই; আমি আজ রাজা নই, বরং একজন সাধারণ সেবক।

দ্বিতীয়ত, পবিত্রতার প্রতীক সোনা। হিন্দু শাস্ত্র মতে, সোনা পৃথিবীর অন্যতম পবিত্র ধাতু। রুপো বা তামা সময়ের সাথে কালিমালিপ্ত বা জারিত হলেও সোনা তার ঔজ্জ্বল্য হারায় না। জগন্নাথ দেব ‘দারুব্রহ্ম’, অর্থাৎ কাঠের রূপে বিরাজমান। তাই তাঁর যাত্রাপথ হতে হবে কলুষমুক্ত। যে ঝাঁটা দিয়ে সেই পথ পরিষ্কার করা হবে, তার পবিত্রতা যেন সর্বোচ্চ হয়—এই কারণেই সোনার ঝাঁটা ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়, ভক্তের হৃদয়ে ও প্রভুর পথে যেন জাতপাত, হিংসা বা অহংকারের বিন্দুমাত্র ধুলো না থাকে।

তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলো সামাজিক সমতা। “ছেরা পহরা” কেবল রাস্তা পরিষ্কারের আচার নয়, এটি সামাজিক সাম্যের প্রতীক। পথ পরিষ্কারের পর রাজা সেই সোনার ঝাঁটা পবিত্র জলে ডুবিয়ে সেই জল উপস্থিত সকল বর্ণের মানুষের গায়ে ছিটিয়ে দেন। ধনী-দরিদ্র, উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ নির্বিশেষে সবাই সেই জল পবিত্র হিসেবে মাথায় তুলে নেন। এমনকি রাজা স্বয়ং অনেক সময় নিচু জাতের মানুষের পা ধুইয়ে দেন। এই প্রথার মাধ্যমে রাজা ঘোষণা করেন যে, ক্ষমতার আসল অর্থ শাসন নয়, বরং সেবা।

রথের রশিতে হাত দেওয়ার আগে এই দৃশ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্ম কেবল মন্ত্র বা উপাচার নয়। ধর্ম মানে বিনয়, ধর্ম মানে সেবা এবং ধর্ম মানে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা। প্রতি বছর এই রীতির মাধ্যমে জগন্নাথ দেব আমাদের অহংকার ত্যাগের শিক্ষা দিয়ে যান।