‘ছাত্র পড়াবো না ভোটার তালিকা শুধরাবো?’ কমিশনের গুরুদায়িত্বে চরম দোটানায় শিক্ষকেরা

দেশজুড়ে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন অর্থাৎ স্পেশাল সামারি রিভিশন (SIR)-এর দিনক্ষণ আজই ঘোষণা হতে চলেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার মূল দায়িত্বে থাকেন বুথ লেভেল অফিসার (BLO)-রা, যাদের একটা বড় অংশই হলেন সরকারি স্কুলে কর্মরত শিক্ষক-শিক্ষিকারা। একদিকে ছাত্র পড়ানো, পরীক্ষার খাতা দেখা, অন্যদিকে ভোটার তালিকা সংশোধনের গুরুদায়িত্ব— এই জোড়া চাপের মুখে কার্যত পেশাগত দায়বদ্ধতার দোটানায় পড়েছেন শিক্ষকরা।

SIR-এর প্রস্তুতি বৈঠকে ইতিমধ্যেই এই চাপের কথা নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছিলেন BLO-রা। কারণ কমিশনের কড়া নির্দেশিকা অনুযায়ী, SIR-এর সঙ্গে যুক্ত কোনো কর্মী-আধিকারিককে এই সময় বদলি করা যাবে না।

বিদ্যালয়ের কাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা
ছাত্র পড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষকদের এখন ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে লেগে পড়তে হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দুই কর্মকাণ্ডের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করা কঠিন হচ্ছে। শিক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, কমিশনের এই অতিরিক্ত দায়িত্বের ফলে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কাজ চরমভাবে ব্যাহত হবে।

নীলাদ্রিশেখর পন্ডা, প্রধান শিক্ষক, ডিহি-জামতলা প্রাথমিক বিদ্যালয় (নন্দীগ্রাম বিধানসভার BLO): তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে তালিকা সংশোধনের কাজে ব্যস্ত থাকলে স্কুলের কাজও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

সঞ্জীব মণ্ডল, ইংরেজির শিক্ষক, দেবীপুর স্টেশন হাই স্কুল (মেমারি বিধানসভার BLO): তাঁর দাবি, SIR সংক্রান্ত ম্যাপিংয়ের কাজের জন্য স্কুলের নিয়মিত পাঠদান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এমনকি, উচ্চ মাধ্যমিকের খাতা দেখার কাজেও সময় দেওয়া যাচ্ছে না। পরিবারকেও সময় দিতে পারছেন না তিনি।

দেবব্রত দত্ত, কর্মশিক্ষার শিক্ষক, নুদিপুর ভূপেন্দ্র স্মৃতি বিদ্যামন্দির (মেমারি বিধানসভার BLO): তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, শিক্ষক হিসেবে প্রথম দায়িত্ব স্কুলের কম্পিউটার ওয়ার্ক তাকেই করতে হয়। সামনে সেমেস্টার পরীক্ষা, তার প্রশ্নপত্র বানানোর কাজও বাকি। একদিকে স্কুল, অন্যদিকে BLO-এর দায়িত্ব, এর ফলে শিক্ষা এবং পরিবার— দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

রাজনৈতিক মহলে তরজা
রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও, সাম্প্রতিককালে এই বুথ লেভেল অফিসারেরাই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছেন। একদিকে রাজনৈতিক দলের লাগাতার হুমকি-হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের কড়া বার্তা – সব মিলিয়ে কার্যত ‘চিঁড়েচ্যাপ্টা’ অবস্থা BLO-দের।

সিপিএম কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী এই প্রসঙ্গে রাজ্য ও কেন্দ্রের দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি বলেন, “রাজ্য সরকার একদিকে টানাটানি করছে, আরেকদিকে কেন্দ্রও করছে। এটা বাস্তবসম্মত নয়।”

এই আবহে, শিক্ষকদের এই বাড়তি দায়িত্ব ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও নতুন করে তরজা শুরু হয়েছে। এখন দেখার, SIR প্রক্রিয়া শুরু হলে বাস্তব পরিস্থিতি ঠিক কী রূপ নেয় এবং শিক্ষকরা কীভাবে এই গুরুদায়িত্ব সামলান।