চিফ জাস্টিসের এজলাসে আর শোনা যাবে না ‘মেনশনিং’-এর সওয়াল-জবাব! কেন এই কঠোর পদক্ষেপ নিল সুপ্রিম কোর্ট?

শীর্ষ আদালতে জরুরি মামলা তালিকাভুক্ত করার আবেদনের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এবার থেকে ভারতের প্রধান বিচারপতির (CJI) এজলাসে নতুন মামলা উল্লেখ করার বা ‘মেনশনিং’ করার পুরো সময় জুড়ে ভার্চুয়াল ভিডিও কনফারেন্সের অডিও সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। বুধবার শীর্ষ আদালতের এই কঠোর সিদ্ধান্তের ফলে জরুরি শুনানির জন্য আইনজীবীদের আবেদন এবং তার জবাবে আদালতের দেওয়া তাৎক্ষণিক মৌখিক মন্তব্য সাধারণ মানুষ বা সংবাদমাধ্যম আর সরাসরি শুনতে পাবেন না।
কয়েক দিন আগেই ভারতের প্রধান বিচারপতি এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে মন্তব্য করেছিলেন যে, কোনও মামলা জরুরি ভিত্তিতে তালিকাভুক্তির জন্য উল্লেখ বা আপিল করা আদতে সম্পূর্ণভাবে আদালতের একটি ‘প্রশাসনিক প্রক্রিয়া’ (administrative exercise) ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি বিচার বিভাগীয় মূল শুনানির মতো কোনও প্রকাশ্য বিষয় নয়, তাই আদালতের এই প্রশাসনিক কথাবার্তা বা প্রাথমিক আর্জি মিডিয়া বা পাবলিকের দ্বারা রিপোর্ট করা উচিত নয়। বুধবারের নতুন নির্দেশিকার মাধ্যমে শীর্ষ আদালত তাদের সেই পূর্বের অবস্থানকেই বাস্তবে রূপায়ণ করল, যার ফলে এখন থেকে ভার্চুয়াল স্ট্রিমিংয়ে এই সংক্রান্ত অডিও আদান-প্রদান আর জনসমক্ষে শোনা যাবে না।
সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘদিনের প্রথা অনুযায়ী, যে সমস্ত মামলায় অবিলম্বে বা জরুরি আইনি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়, সেই মামলাগুলির দ্রুত শুনানির আর্জি জানাতে আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে ‘মেনশনিং’ করে থাকেন। বহু বছর ধরে দেখা গেছে, জনস্বার্থ মামলা (PIL), রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয় কিংবা জটিল সাংবিধানিক মামলার ক্ষেত্রে এই পথেই দ্রুত প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিগোচর করা হয়। এই প্রক্রিয়ার সময় প্রধান বিচারপতি আর্জি শুনে সিদ্ধান্ত নেন যে বিষয়টি আজ বা কালই জরুরি ভিত্তিতে শুনবেন নাকি খারিজ করবেন, এবং সেই সময় বেঞ্চ থেকে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ মৌখিক মন্তব্যও করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মামলা প্রধান বিচারপতির এজলাসে ‘মেনশনিং’-এর জন্য তোলা হচ্ছিল। মামলা মূল শুনানির তালিকায় আসার আগেই বিচারপতির মৌখিক পর্যবেক্ষণ ও আইনজীবীদের সওয়াল-জবাব জাতীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত ও প্রচারিত হচ্ছিল। যা অনেক সময় বিচার প্রক্রিয়ার ওপর অনাবশ্যক বাড়তি আলো ফেলেছিল এবং বিভ্রান্তি তৈরি করছিল। সেই আইনি জটিলতা ও অনভিপ্রেত বিতর্ক এড়াতেই এই অভিনব পদক্ষেপ করা হয়েছে। অডিও মিউট করে দেওয়ায় ভিডিও স্ট্রিমিং চালু থাকলেও, লাইভ লিঙ্কের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ বা সংবাদমাধ্যম এই প্রশাসনিক আলোচনার কোনও শব্দই আর শুনতে পাবেন না।
সুপ্রিম কোর্টের এই নতুন নির্দেশের ফলে মূল বিচার প্রক্রিয়া (judicial hearing) এবং মামলার জরুরি তালিকা নির্ধারণের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার (administrative process) মধ্যে এক স্পষ্ট সীমারেখা টানা হল। যদিও আদালতের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনো পৃথক বা দীর্ঘ ব্যাখ্যা জারি করা হয়নি, তবে প্রধান বিচারপতির আগের মন্তব্য এবং নির্দেশেই অত্যন্ত স্পষ্ট যে, জরুরি তালিকাভুক্তির আর্জি জানানো নিছকই এক প্রশাসনিক বিষয় এবং তাকে মূল রিপোর্টিংয়ের আওতার বাইরে রাখা উচিত বলেই মনে করছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।