চাকরি দেওয়ার নামে ৬ কোটির প্রতারণা! বিধায়কের পিএ-র কুকীর্তিতে কাঁপছে রাজ্য, ঘটনার পরেই কোথায় উধাও হলো সে?

তেলাঙ্গানার রাজ্য রাজনীতিতে এই মুহূর্তে এক চরম চাঞ্চল্যকর ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা সামনে এসেছে। ভাদ্রাচলমের কংগ্রেস বিধায়ক তেলাম ভেঙ্কটা রাওয়ের ব্যক্তিগত সহকারী তথা আপ্তসহায়ক (PA) কল্যাণ বেকার যুবক-যুবতীদের সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে প্রায় ৬ কোটি টাকা প্রতারণা করে আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মিথ্যে প্রতিশ্রুতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর থেকেই অভিযুক্ত পিএ কল্যাণ বর্তমানে গা-ঢাকা দিয়েছেন। পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর সন্ধানে ইতিমধ্যেই জোর তল্লাশি শুরু হয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, অভিযুক্ত পিএ কল্যাণ অত্যন্ত সুকৌশলে এলাকার বেকার যুবক-যুবতীদের টার্গেট করতেন। তিনি চাকরিপ্রার্থীদের বিশ্বাস করাতেন যে, রাজ্য সরকার বিধায়ককে বিশেষ নিয়োগের ক্ষমতা প্রদান করেছে। এই বিশেষ ক্ষমতার জোরে তিনি খুব সহজেই যেকোনো যোগ্য প্রার্থীকে সরকারি চাকরি পাইয়ে দিতে সক্ষম। তবে এই কাজের জন্য প্রতিটি প্রার্থীর কাছ থেকে অগ্রিম ১০ লক্ষ টাকা করে দাবি করা হতো। পুলিশ সূত্রে প্রাথমিক অনুমান, এই প্রতারণার জাল শুধু তেলাঙ্গানার খাম্মাম জেলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং অন্ধ্রপ্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও এর জাল বিস্তার লাভ করেছিল। মানুগুরু, বুরগামপাদ এবং অশ্বপুরমের মতো এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার নাম করে তিনি একাধিক প্রার্থীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা তুলেছিলেন বলে অভিযোগ।
এই ভয়াবহ প্রতারণার শিকার হয়েছেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের সাধারণ মানুষ। জানা গেছে, এক দরিদ্র অটো-রিক্সাচালক তাঁর কোনো এক আত্মীয়ের চাকরির আশায় ধারদেনা করে ১০ লক্ষ টাকা তুলে দিয়েছিলেন কল্যাণের হাতে। শুধু তাই নয়, একজন টেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার পদের জন্য পাইয়ে দেওয়ার নামে এক লাফে ৩০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এমনকি এক গ্রাম পঞ্চায়েত প্রতিনিধি এবং এক অসহায় মহিলার কাছ থেকেও ১০ লক্ষ টাকা নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীকালে ওই মহিলা যখন পুরো বিষয়টি খোদ বিধায়ককে জানিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন, তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে অভিযুক্ত পিএ তাঁকে কিছু টাকা ফেরতও দিতে বাধ্য হন।
ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ যখন বুঝতে পারেন যে তাঁরা এক বিরাট প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়েছেন, তখন গত বৃহস্পতিবার বেশ কয়েকজন অভিযোগকারী সরাসরি পুলিশ প্রশাসন ও বিধায়কের সঙ্গে দেখা করে সমস্ত ঘটনা বিস্তারিতভাবে জানান। এই প্রসঙ্গে ভাদ্রাচলমের বিধায়ক তেলাম ভেঙ্কটা রাও পরিষ্কার জানিয়েছেন যে, অভিযোগকারীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করার পরেই তিনি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন। তিনি কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, “আমি পুলিশ কর্মকর্তাদের আমার আপ্ত সহায়ককে দ্রুত গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিয়েছি। পাশাপাশি আমি সকলকে সতর্ক করছি, কেউ যেন চাকরির জন্য কাউকে এক পয়সাও না দেন। রাজ্যের কোথাও অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই।” উল্লেখ্য, ওই বিধায়ক পূর্বে ভারত রাষ্ট্র সমিতি (বিআরএস)-এর টিকিটে জয়ী হলেও, ২০২৩ সালে রাজ্যে কংগ্রেস সরকার গঠনের পর তিনি কংগ্রেস শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন।
এই গুরুতর জালিয়াতির ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ ইতোমধ্যে একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ডিএসপি অরুণ কুমার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, সুনির্দিষ্ট ধারায় একটি ফৌজদারি মামলা রুজু করা হয়েছে এবং অভিযুক্তকে ধরতে জোরদার তদন্ত চলছে। প্রাথমিক তদন্তে খাম্মাম জেলাতেই প্রায় ৬ কোটি টাকা আদায়ের প্রমাণ মিললেও, অন্ধ্রপ্রদেশ সহ অন্যান্য neighbouring এলাকায় মোট প্রতারণার অংকটি আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তদন্তকারীরা। ভোটের মরসুম ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাঝে এই বড়োসর দুর্নীতি ও প্রতারণার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। এখন দেখার বিষয়, পুলিশ কত দ্রুত এই ধূর্ত প্রতারক পিএকে পাকড়াও করতে সক্ষম হয়।