চাকরি দেওয়ার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা লোপাট! অনুব্রত মণ্ডল ও জীবনকৃষ্ণ সাহার বিরুদ্ধে সরাসরি বিস্ফোরক মামলা

চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে শিক্ষক পদ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে প্রতারণার চাঞ্চল্যকর মামলায় এবার আইনি জালে সরাসরি নাম জড়াল বীরভূমের হেভিওয়েট নেতা অনুব্রত মণ্ডল এবং প্রাক্তন বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহার। সিউড়ি জেলা আদালতের কঠোর নির্দেশের পরই নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ প্রশাসন। আদালতের নির্দেশ মেনে অনুব্রত মণ্ডল ও জীবনকৃষ্ণ সাহা সহ মোট ছয় প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে সিউড়ি থানার পুলিশ। সম্প্রতি এই সংক্রান্ত একটি চাঞ্চল্যকর তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট সিউড়ি জেলা আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ প্রশাসন, যা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে ফের একবার চরম শোরগোল শুরু হয়েছে।
কল্যাণ ঘোষ নামক এক স্থানীয় ব্যক্তির দায়ের করা একটি বিশেষ মামলার ভিত্তিতেই এই প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অভিযোগকারী কল্যাণ ঘোষের আইনজীবী সোমনাথ মুখোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে জানিয়েছেন, “আমার মক্কেল বহু আগেই এই বিষয়ে স্থানীয় থানায় অভিযোগ দায়ের করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবে পুলিশ সেই অভিযোগ গ্রহণ করতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। বাধ্য হয়েই আমরা আদালতের দারস্থ হই এবং আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশেই পুলিশ নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে চাকরি দেওয়ার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু কাউকেই কোনো চাকরি দেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিগত ২০১৭ সাল থেকে এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণ ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল।”
বীরভূমের সদাইপুর থানার সাহাপুর গ্রামের বাসিন্দা কল্যাণ ঘোষের বিস্ফোরক অভিযোগ অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাঁর এবং তাঁর নিকট আত্মীয়দের কাছ থেকে বিভিন্ন দফায় বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করা হয়েছিল। ২০১৭ সাল থেকে শুরু করে কারও কাছ থেকে ৬ লক্ষ, কারও কাছ থেকে ৩ লক্ষ আবার কারও কাছ থেকে ২ লক্ষ টাকা করে নগদ অর্থ নেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, টাকার বিনিময়ে বিশ্বাস অর্জনের জন্য ভুক্তভোগীদের হাতে ভুয়া নিয়োগপত্রও তুলে দেওয়া হয়েছিল, যা সেই সময় বীরভূম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটেও দেখতে পাওয়া গিয়েছিল বলে দাবি। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত কোনো চাকরি মেলেনি।
তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই গোটা প্রতারণা চক্রের নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন দোর্দণ্ডপ্রতাপ তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডল, প্রাক্তন বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহা, তৎকালীন বীরভূম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতি তথা অনুব্রতর ভাগ্নে রাজা ঘোষ-সহ মোট ছয় প্রভাবশালী ব্যক্তি। ২০১৭ সালে যখন কল্যাণবাবু সিউড়ি থানায় এই বিষয়ে প্রতারণার অভিযোগ দায়ের করতে গিয়েছিলেন, তখন পুলিশের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক চাপে অভিযোগ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ১১ জুন সদাইপুরের বাসিন্দা কল্যাণ ঘোষ সরাসরি সিউড়ি জেলা আদালতের শরণাপন্ন হন এবং অনুব্রত মণ্ডল সহ ৬ জনের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযোগ দায়ের করেন। মামলার গুরুত্ব বিচার করে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগ গ্রহণ করে অবিলম্বে তদন্তের নির্দেশ দেন। আদালতের এই কড়া নির্দেশ পাওয়ার পরেই নড়েচড়ে বসে বীরভূম পুলিশ। এরপরেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪২০ (প্রতারণা), ৪০৬ (বিশ্বাস ভঙ্গ) এবং ৩৪ (সংগঠিত অপরাধ) ধারায় সুনির্দিষ্ট মামলা রুজু করা হয় এবং সেই তদন্তের বিশদ রিপোর্ট আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, স্থানীয় দুই প্রাথমিক শিক্ষক প্রসেনজিৎ ঘোষ ও উত্তম ঘোষ সরাসরি কল্যাণ ঘোষ ও তাঁর আত্মীয়দের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা তুলে অন্যদের হাতে পৌঁছে দিয়েছিলেন, ফলে এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত সকলের বিরুদ্ধেই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে ২০২১ সালের ভোট-পরবর্তী হিংসার জেরে শান্তিনিকেতন থানার অধীনস্থ আদিত্যপুরে একটি ইটভাটায় লুটপাটের চাঞ্চল্যকর মামলায় সিউড়ি জেলা আদালত অনুব্রত মণ্ডলের জামিনের আবেদন সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছিল। সেই ধাক্কা কাটতে না কাটতেই এবার প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় নাম জড়ানোয় বীরভূমের কেষ্টর আইনি জটিলতা আরও বহু গুণে বেড়ে গেল। যদিও এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগ এবং নতুন আইনি পদক্ষেপ প্রসঙ্গে অনুব্রত মণ্ডলের তরফ থেকে বর্তমানে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।