গোপন খাজার লোভ দেখিয়ে ১৩ লাখ টাকার প্রতারণা! পাথরে সোনার জল মিশিয়ে সর্বস্বান্ত করল বন্ধু

বন্ধুত্বে বিশ্বাস ও আস্থার জায়গাটি কতটা ঠুনকো হতে পারে, তার এক মর্মান্তিক ও অদ্ভুত উদাহরণ সামনে এল তেলেঙ্গানার নিজামাবাদ জেলায়। ঋণ পরিশোধের তাগিদ এড়াতে এক ব্যক্তি এমন এক অভিনব ও চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন, যা শুনে হতবাক খোদ পুলিশও। লুকিয়ে রাখা গুপ্তধন ও খাঁটি সোনার লোভ দেখিয়ে এক সহজ-সরল মানুষকে কোটিপতি বানানোর স্বপ্ন দেখিয়ে সর্বস্বান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমানে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি পুরো এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, পুরো ঘটনাটি ঘটেছে তেলেঙ্গানার নিজামাবাদ জেলার দিচপল্লী পুলিশ স্টেশন এলাকায়। ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তের মধ্যকার আর্থিক লেনদেনই এই অপরাধের মূল শিকড়। জানা গেছে, শ্রীनिवास নামক এক ব্যক্তি নিজামাবাদ শহরের হমালওয়াড়ি এলাকার বাসিন্দা রমেশের কাছ থেকে জরুরি প্রয়োজনে ১৩ লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই টাকা ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও, দীর্ঘদিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও শ্রীनिवास তা পরিশোধ করতে পারেননি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঋণের পরিমাণ ও রমেশের টাকার তাগিদ বাড়তে থাকে। রমেশ যখনই তার পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করতেন, তখনই শ্রীনিবাস কোনো না কোনো অজুহাতে সময় বাড়িয়ে নিতেন। কিন্তু একসময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, শ্রীनिवासের পক্ষে সেই বিশাল পরিমাণ টাকা ফিরিয়ে দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আর ঠিক তখনই পাওনাদারকে চিরতরে চুপ করিয়ে দেওয়ার এবং উল্টো তার কাছ থেকে আরও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী ও জঘন্য পরিকল্পনা মাথায় আসে শ্রীনিবাসের।

ঋণ পরিশোধের ঝামেলা থেকে বাঁচতে শ্রীনিবাস এক আজব ও কাল্পনিক গল্প ফেঁড়ে বসেন। তিনি রমেশকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, ভাগ্য তার ওপর প্রসন্ন হয়েছে এবং তিনি এমন একটি গোপন জায়গার সন্ধান পেয়েছেন যেখানে প্রচুর গুপ্তধন লুকিয়ে রয়েছে। সেই গুপ্তধনের মধ্যে খাঁটি সোনার বহু মূল্যবান টুকরো বা পাথর রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। শ্রীনিবাস অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে রমেশকে বিশ্বাস করান যে, তার পুরোনো ১৩ লাখ টাকার ঋণের পরিবর্তে তিনি ওই মহামূল্যবান সোনার পাথরগুলো তাকে দিয়ে দেবেন।

লোভ ও বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে রমেশ সেই ফাঁদে পা দেন। শ্রীনিবাস তাকে শর্ত দেন যে, দিচপল্লী মণ্ডলের ঘনপুর এলাকায় নগদ ৩২ হাজার টাকা নিয়ে আসতে হবে। গচ্ছিত পাওনা টাকা উদ্ধার এবং অমূল্য সোনার পাথর পাওয়ার মোহে অন্ধ হয়ে রমেশ কোনো কিছু না ভেবেই ঠিক সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে যান এবং শ্রীনিবাসের হাতে নগদ ৩২ হাজার টাকা তুলে দেন। এরপর শ্রীনিবাস অত্যন্ত সুকৌশলে চারটি পাথর রমেশের হাতে তুলে দেয় এবং দাবি করে যে এগুলো অত্যন্ত মূল্যবান খাঁটি সোনার পাথর।

প্রাথমিকভাবে রমেশ অত্যন্ত খুশি হলেও, কিছু সময় পর তার মনে তীব্র সন্দেহ দানা বাঁধে। তিনি পাথরগুলোকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এবং কাছ থেকে পরীক্ষা করে দেখার সিদ্ধান্ত নেন। আর তখনই তার চোখ কপালে ওঠে। তিনি বুঝতে পারেন যে এগুলো আদতে কোনো মূল্যবান সোনা নয়, বরং সাধারণ সাধারণ পাথরের ওপর অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে সোনার প্রলেপ বা জল বা পলিথিনের মতো আস্তরণ লাগিয়ে তাকে চরমভাবে ধোঁকা দেওয়া হয়েছে।

নিজের ভুল বুঝতে পেরে এবং এক বন্ধু কীভাবে বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে তা অনুধাবন করে রমেশের পায়ের তলার মাটি সরে যায়। তিনি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সরাসরি দিচপল্লী পুলিশ স্টেশনে হাজির হন এবং অভিযুক্ত শ্রীনিবাসের বিরুদ্ধে একটি লিখিত প্রতারণার অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগ পাওয়ার পরপরই নড়েচড়ে বসেছে দিচপল্লী থানা পুলিশ। পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে পুরো বিষয়টি আমলে নিয়ে একটি এফআইআর নথিভুক্ত করেছে এবং ঘটনার নেপথ্যে থাকা সমস্ত তথ্য ও প্রমাণের তদন্ত শুরু করেছে। পলাতক অভিযুক্ত শ্রীনিবাসের সঠিক পরিচয় শনাক্ত করতে এবং তাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশ একাধিক টিম গঠন করে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে।

এই ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে কঠোর সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অলৌকিক গুপ্তধন, মাটির নিচের সোনা বা এই ধরনের লোভনীয় অফারের ফাঁদে পা দিয়ে মানুষ যেন কোনোভাবেই প্রতারিত না হন। এ ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে অপরাধীরা সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে সর্বস্ব লুটে নেয়। তাই সমাজের প্রতিটি নাগরিককে এই ধরনের সামাজিক অপরাধ ও জালিয়াতি থেকে সতর্ক থাকার এবং কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।