কেন অনামি দলে যোগ দিলেন তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা? নেপথ্যে বিজেপির মাস্টারপ্ল্যান!

তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ভূমিকম্প। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে কার্যত চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দল ছাড়লেন প্রায় ২০ জন লোকসভা সাংসদ। কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায় ও সায়নী ঘোষের মতো হেভিওয়েট নেতারা যোগ দিলেন ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (NCPI) নামক এক কার্যত অপরিচিত ও অস্তিত্বহীন রাজনৈতিক দলে। ২০২৩ সালে ত্রিপুরায় মাত্র ৮০০ ভোট পাওয়া এই দলকে বেছে নেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে সুগভীর রাজনৈতিক অঙ্ক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিধানসভার বিদ্রোহী বিধায়কদের পথ অনুসরণ না করে সাংসদরা বেছে নিয়েছেন এক নিরাপদ কৌশল। বিধায়করা সরাসরি দল ভেঙে ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করে আইনি জটে জড়িয়েছেন। কিন্তু লোকসভার সাংসদরা এনডিএ-কে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলত্যাগ বিরোধী আইনের (Anti-Defection Law) ফাঁদ এড়াতে চেয়েছেন। যেহেতু তৃণমূলের মোট ২৮ জন সাংসদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই বিদ্রোহে সামিল, তাই স্পিকারকে জানিয়ে তাঁরা আইনি সুরক্ষা কবজ তৈরি করে ফেলেছেন।
এই পুরো নাটকের নেপথ্যে বিজেপির অদৃশ্য হাতের ছাপ স্পষ্ট। বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের বাংলোতে শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতে বিদ্রোহী সাংসদদের বৈঠক ও পরবর্তী রণকৌশল চূড়ান্ত হয়েছে। বিজেপির লক্ষ্য আপাতত এই সাংসদদের দলে নেওয়া নয়, বরং সংসদের গুরুত্বপূর্ণ ভোটাভুটিতে তাদের সমর্থন আদায় করে নেওয়া। বিশেষ করে রাজ্যসভার সমীকরণ মেলাতে বিজেপি এই বিদ্রোহী সাংসদদের তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।
তৃণমূলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দল সম্পূর্ণভাবে চেয়ারপার্সন-কেন্দ্রিক। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের চেয়ে সাংগঠনিক নেতাদের প্রভাব বেশি হওয়ায় দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমেছিল সাংসদদের মনে। এছাড়াও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবিষ্যতে কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে এক গভীর আশঙ্কা বিদ্রোহীদের মধ্যে কাজ করছিল। সেই পরিস্থিতিতে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং দলত্যাগ বিরোধী আইনের হাত থেকে বাঁচতে এই দ্রুত দলবদলের কৌশল।
মমতা ও অভিষেকের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেই বিদ্রোহীদের এই যাত্রা শুরু। প্রতীক বা তহবিলের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও, সাংগঠনিক পদাধিকারীদের একাধিপত্য থেকে বেরিয়ে এসে সাংসদরা এখন বিজেপির ছায়ায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পশ্চিমবঙ্গ তথা জাতীয় রাজনীতিতে আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।