কুম্ভমেলা নয়, সুদূর নেদারল্যান্ডসে ৪০ বছর পর অলৌকিক পুনর্মিলন! দুই ভারতীয় বোনের গল্প হার মানাবে সিনেমাকেও

কুম্ভমেলায় পরিবারের সদস্যদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার গল্প বা হারিয়ে যাওয়া শিশুরা বহু বছর পর বাবা-মাকে ফিরে পাওয়ার ঘটনা অনেকেই শুনেছেন। কিন্তু ভারত থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে নেদারল্যান্ডসে ৪০ বছর পর দুই বিচ্ছিন্ন বোনের পুনর্মিলনের এই অনন্য গল্প শুনলে আপনি শুধু বিশ্বাসই করবেন না, প্রকৃতির এই আশ্চর্য কাণ্ডে বিস্মিতও হবেন। এর সঙ্গে আরও একটি মজার বিষয় হল, এই দুই বোন নেদারল্যান্ডসে ডাচ পরিবারে বেড়ে উঠলেও, ভারতের সঙ্গে তাঁদের অত্যন্ত গভীর এবং রক্তমাংসের সম্পর্ক রয়েছে।
একেবারে রূপকথার মতো সিনেমার গল্প দুই বোন মীনা গেলটিঙ্ক এবং মিনাল টিজসেনের। এই দুই বোনের জন্ম একটি ভারতীয় পরিবারে হয়েছিল। কিন্তু শৈশবে কোনও কারণে তাঁদের দু’জনকেই একটি অনাথ আশ্রমে রেখে দেওয়া হয়। এরপরই শুরু হয় কাকতালীয় ঘটনা এবং প্রকৃতির এক আশ্চর্য অধ্যায়। নেদারল্যান্ডসে বসবাসকারী দুটি আলাদা ডাচ পরিবার এই দুই বোনকেই পৃথকভাবে দত্তক নিয়ে নেয়। দুই বোন নেদারল্যান্ডসে আলাদা আলাদাভাবে বড় হয়ে ওঠেন এবং তাঁদের আলাদা পদবিও হয়। একজন গেলটিঙ্ক এবং অন্যজন টিজসেন হন। যদিও তাঁদের আসল ভারতীয় নাম মীনা ও মিনালই থেকে যায়।
শৈশব থেকে প্রায় ১০ বছর বয়স পর্যন্ত দুই বোনই স্বচ্ছন্দে ডাচ পরিবারের সঙ্গে বেড়ে উঠছিলেন। এরপর ১৯৯৬ সালে নেদারল্যান্ডসে দত্তক নেওয়া শিশুদের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অন্যান্য শিশুদের সঙ্গে এই দুই বোনও উপস্থিত ছিলেন। অন্যান্য শিশুদের মতো তাঁরাও সেখানে একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন। কথাবার্তার পর জানা যায়, দু’জনেরই জন্ম ভারতে এবং সেখান থেকেই তাঁদের আলাদা পরিবার দত্তক নিয়েছিল। নেদারল্যান্ডসেও তাঁদের বাড়ির মধ্যে দূরত্ব ছিল মাত্র ১০০ মাইল। সেদিন দু’জনে অনেকক্ষণ কথা বলেন এবং তাঁদের মুখের মিলও এতটাই বেশি ছিল যে, অন্য শিশুরা তাঁদের বোন বলেও ডাকতে শুরু করেছিল।
যদিও তাঁরা বাড়ি ফিরে যান এবং কিছুদিন ফোনে বা চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ রাখেন, তবুও জীবনের ব্যস্ততায় প্রায় ১৫ বছরের জন্য তাঁদের এই সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মীনা এবং মিনাল দু’জনেই নিজেদের পারিবারিক জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে এত দীর্ঘ সময়ের মধ্যেও বহুবার মীনা ও মিনাল নিজ মনে এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করতেন। অবশেষে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মিনাল ‘মাই হেরিটেজ’-এর একটি ডিএনএ পরীক্ষা করান। ফোনে যখন পরীক্ষার ফলাফল আসে, সেখানে দেখা যায় ‘মীনা-সিস্টার’। ডিএনএ পরীক্ষায় তাঁদের দু’জনের ১০০ শতাংশ মিল পাওয়া যায় এবং প্রমাণিত হয় যে তাঁরা সহোদর বোন।
বিষয়টি নিশ্চিত হতেই মিনালের চোখে জল চলে আসে। তিনি জানান, ‘‘আমরা প্রথমে বন্ধু ছিলাম, পরে বোন হয়েছি, কিন্তু আসলে আমরা সবসময়ই বোন ছিলাম, শুধু আমরা তা জানতাম না।” সম্প্রতি ১১ অগাস্ট নেদারল্যান্ডসে দু’জনে দেখা করেন এবং একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। মীনা মিনালকে জানান, “তোমাকে দেখলে আমার মনে হয় যেন আমি বাড়ি ফিরে এসেছি।” বর্তমানে মিনাল ফ্রান্সে তাঁর সঙ্গী ও দুই ছেলের সঙ্গে থাকেন এবং মীনা তিন সন্তানের মা। দু’জনে এখন প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে হারিয়ে যাওয়া বছরগুলোর ঘাটতি পূরণ করছেন।