কি ভয়ংকর রূপ এল নিনোর! শুকনো মরুভূমি আজ বেগুনি ফুলের চাদর, জাপানে রেকর্ড বৃষ্টি!

বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে সর্বগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে ‘এল নিনো’। বিগত কয়েক বছর ধরে এর চরম প্রভাব প্রত্যক্ষ করে চলেছেন বিশ্ববাসী। স্প্যানিশ ভাষায় ‘এল নিনো’-র আক্ষরিক অর্থ ‘ছোট বালক’। ১৬০০-এর দশকে দক্ষিণ আমেরিকার স্প্যানিশ জেলেরা প্রথম এই নামকরণ করেছিলেন। তাঁরা লক্ষ্য করেছিলেন, সমুদ্রের জল উষ্ণ হয়ে উঠলে প্রবল বৃষ্টি ও ঝড় হয় এবং মাছ ধরার ক্ষেত্রে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। সাধারণত ক্রিসমাসের সময় এই প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে গত কয়েক দশকে এই প্রাকৃতিক ঘটনার স্থায়িত্ব অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছর ডিসেম্বরের সর্বোচ্চ তীব্রতার পূর্বাভাসের আগেই এটি আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) মতে, এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের নানা প্রান্তে অস্বাভাবিক ও চরম আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এর জলজ্যান্ত প্রমাণ পাওয়া গেছে চিলির আটাকামা মরুভূমি এবং জাপানের রাজধানী টোকিওতে। পৃথিবীর মেরু-বহির্ভূত সবচেয়ে শুষ্ক মরুভূমি হিসেবে পরিচিত আটাকামায় এবার ফুলের অভাবনীয় সমারোহ দেখা গিয়েছে। শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে সেপ্টেম্বরে সেখানে প্রায় ২০০ প্রজাতির লক্ষ লক্ষ ফুল ফুটে ওঠে। মনোরম এই দৃশ্য দেখতে আসা পর্যটকদের ক্যামেরায় বন্দী ছবিতে দেখা যায়, শুষ্ক মরুভূমিটি যেন এক অপূর্ব বেগুনি রঙের গালিচায় ঢাকা পড়েছে।
আটাকামা মরুভূমিটি প্রশান্ত মহাসাগর ও আন্দিজ পর্বতমালার মাঝখানে অবস্থিত এবং চিলির উত্তর উপকূল বরাবর প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। জুলাই ও আগস্ট মাসে চিলির বেশ কয়েকটি অঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে আবহাওয়ার পরিমাপ শুরু হওয়ার পর এই প্রথম এমন নজিরবিহীন ঘটনা ঘটল। কিছু কিছু এলাকায় ১৮০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। চিলির বন বিভাগ ‘কোনাফ’-এর আটাকামা জীববৈচিত্র্য বিষয়ক প্রধান সিজার পিজারো জানিয়েছেন, এমন ঘটনা আগে কখনও নথিভুক্ত হয়নি।
অন্যদিকে, ঠিক একই সময়ে টোকিও এল নিনোর কারণে সৃষ্ট ‘বৃষ্টিজনিত ক্লান্তি’ ও চরম দুর্ভোগের মুখোমুখি হয়েছিল। জাপানের রাজধানীতে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে টানা বৃষ্টিপাত হয়েছে। যার জেরে শাকসবজির দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পর্যটন খাতের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি, টোকিওর কোটি কোটি মানুষ উৎকণ্ঠায় দিন কাটিয়েছেন যে তাঁরা আদৌ আর কখনো সূর্যের আলো দেখতে পাবেন কি না। ‘মাইনিচি শিমবুন’-এর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে মধ্য টোকিওতে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে সেখানে মাত্র ৪৫.৮ ঘণ্টা সূর্যের আলো পাওয়া গিয়েছে, যা এযাবৎকালের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। টানা ১৪ দিন সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। টোকিওতে এটিই ছিল দীর্ঘতম বৃষ্টিপাতের সময়কাল, যা ২০১৯ সালের ২৭ জুন থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত চলা ৩৩ দিনের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে সতর্ক করেছে যে, চলতি বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছাতে পারে। রাষ্ট্রসংঘের এই সংস্থাটি আরও জানিয়েছে যে, ১৯৫০ সালের পর থেকে দেখা যাওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ‘এল নিনো’গুলোর মধ্যে এটি অন্যতম এবং এর প্রভাব ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।