কার্তিকের পাশে নবপত্রিকা আর দুর্গার আগেই মনসা বিসর্জন! ৩০০ বছরের পুরনো এই জমিদার বাড়ির পুজো দেখলে চোখ কপালে উঠবে!

দিন কয়েক পরেই বাংলার ঘরে ঘরে বেজে উঠবে মা আসার আনন্দধ্বনি। আর এই শারদোৎসবের আবহেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের প্রাচীন ও বনেদি বাড়িগুলির পুজোর নানা অজানা রীতি ফের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। ঠিক তেমনই এক অনন্য ঐতিহ্যের সাক্ষী পশ্চিম বর্ধমানের কাঁকসার কুলডিহা চট্টোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গাপুজো। প্রায় তিনশো বছরেরও বেশি পুরনো এই বনেদি বাড়ির পুজোয় এমন কিছু ব্যতিক্রমী নিয়ম মানা হয়, যা সচরাচর অন্য কোথাও দেখা যায় না।

ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, ১১১১ বঙ্গাব্দে জমিদার জনকিনাথ চট্টোপাধ্যায় এই পুজোর গোড়াপত্তন করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জমিদারির জাঁকজমক বা অবসান ঘটলেও এতটুকু মলিন হয়নি কুলডিহার এই দুর্গোৎসবের ঐতিহ্য। সারা বছর দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা পরিবারের সদস্যরা পুজোর কটা দিন এই জমিদার বাড়িতেই একত্রিত হন। দুবেলা একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা আর পুজোর হুল্লোড়ে ফের প্রাণ ফিরে পায় হারিয়ে যাওয়া একান্নবর্তী পরিবারটি।

তবে এই পুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর আচার-অনুষ্ঠান। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী নবপত্রিকা সাধারণত গণেশের পাশে রাখা হলেও, এই বাড়ির রীতিনীতি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে কার্তিকের পাশেই স্থান পায় নবপত্রিকা। শুধু তাই নয়, কুলডিহা জমিদার বাড়ির আরও এক মস্ত বড় বৈশিষ্ট্য হলো, মা দুর্গার বিসর্জনের আগেই এখানে সম্পন্ন হয় মা মনসার নিরঞ্জন।

বৈষ্ণব মতে পুজো হওয়ায় এই পরিবারে বলি প্রথার কোনো প্রচলন নেই। কুলডিহার এই দুর্গমন্দিরের চারপাশে রয়েছে দুটি শিবমন্দির, একটি মনসা মন্দির এবং একপাশে রঘুনাথের মন্দির। জমিদার জনকিনাথ চট্টোপাধ্যায় তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মীদেবীর নামানুসারে যে ‘লক্ষ্মীসায়ের’ বা তালপুকুর তৈরি করেছিলেন, আজও সেই পুকুরের পবিত্র জলেই হয় নবপত্রিকার স্নান। এরপর জাঁকজমকপূর্ণভাবে দোলায় করে সেই নবপত্রিকা নিয়ে আসা হয় চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে, যেখানে বাড়ির বিবাহিত মহিলারা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তা বরণ করেন।

পুজোর রীতির পাশাপাশি ভোগের ক্ষেত্রেও রয়েছে অভিনব আয়োজন। এই বনেদি বাড়িতে কোনো রাঁধুনি বা ঠাকুর রাখা হয় না, বাড়ির পুরুষ সদস্যরাই নিজ হাতে মায়ের ভোগ রান্না করেন। সপ্তমীতে সাত সের চালের ভাত থেকে শুরু করে নানা পদের ভাজা ও ব্যঞ্জন নিবেদন করা হয়। অষ্টমীতে সেই পরিমাণ বেড়ে হয় আট সের, আর নবমীতে হয় নয় সের চাল বা ডালে বিশেষ খিচুড়ি ভোগ।

দশমীর দিন এই পুজোর রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায়। সন্ধিপুজোয় বাড়ির মহিলারা দাঁড় সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন। এরপর মায়ের প্রতিমা বিসর্জনের ঠিক আগেই হয় মা মনসার বিসর্জন। সন্ধ্যার সময়ে এলাকার মানুষেরা জমিদারি আমলের ঐতিহ্য মেনে লাঠিখেলার প্রদর্শন করেন, আর সেই প্রাচীন রীতিকে আঁক ধরেই কাঁধে করে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় পাশের জানকি বাঁধে। চারপাশের আধুনিকতার যুগেও কুলডিহা চট্টোপাধ্যায় বাড়ির পুজো আজও ধরে রেখেছে তাদের সেই শতবর্ষের পুরনো শিকড় ও আবহমান বাংলার সাবেকি ঐতিহ্য।

Pratik Saha
  • Pratik Saha