কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথম বিশ্বজয় থেকে শুরু করে দেশভাগের বাস্তব রূপ! একনজরে ভারতীয় সিনেমার সোনালি ইতিহাস

ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছর পেরিয়ে দেশ যখন ৮০তম স্বাধীনতা উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন ফিরে দেখা দরকার সেই উত্তাল সময়কে—যেখান থেকে জন্ম নিয়েছিল আজকের আধুনিক ভারতীয় চলচ্চিত্র। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং স্বাধীনতার রক্তক্ষয়ী পটভূমি যেমন মানুষের জীবনকে তছনছ করেছিল, তেমনই শিল্প ও সংস্কৃতিতেও এনেছিল এক অভূতপূর্ব রূপান্তর। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সালের এই পাঁচ বছর ছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় যুগান্তকারী মাইলফলক। গণনাট্য সংঘের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সমসাময়িক সামাজিক সংকট ও বাস্তবধর্মী গল্পগুলো উঠে আসতে শুরু করে রূপোলি পর্দায়। সেই সোনালি যুগের কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা নিচে আলোচনা করা হলো:

১. কান চলচ্চিত্র উৎসবে ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম বিশ্বজয় (১৯৪৬):
১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম কান চলচ্চিত্র উৎসবে চেতন আনন্দ পরিচালিত ‘নীচা নগর’ সিনেমাটি সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘গ্র্যান্ড প্রিক্স’ জিতে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের প্রথম বিশ্বজয় নিশ্চিত করে। ম্যাক্সিম গোর্কির নাটক ‘দ্য লোয়ার ডেপ্থস’ অবলম্বনে তৈরি এই ছবি ভারতীয় বিনোদন জগতে ‘সমান্তরাল ধারা’ বা ‘সোশাল রিয়ালিজম’-এর শক্ত ভিত তৈরি করেছিল।

২. প্রথম অস্কার-মনোনীত ব্যক্তিত্বের ঐতিহাসিক অভিষেক (১৯৪৬):
একই বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘নীচা নগর’ ছবির মাধ্যমেই কিংবদন্তি সেতার বাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেন। পরবর্তীতে রিচার্ড অ্যাটেনবরো পরিচালিত ‘গান্ধি’ চলচ্চিত্রের আবহ সঙ্গীতের জন্য তিনি অস্কারের মূল প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ মৌলিক সঙ্গীতের মনোনয়ন লাভ করেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় সঙ্গীতজ্ঞ যিনি এই গৌরব অর্জন করেছিলেন।

৩. অল ইন্ডিয়া রেডিওতে স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা (১৯৪৭):
১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট ভোর সাড়ে ৫টায় অল ইন্ডিয়া রেডিওর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিশ্বে ভারতের স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা করেছিলেন ২৫ বছর বয়সী তরুণ সংবাদ পাঠক ও অভিনেতা পূর্ণম বিশ্বনাথন। মধ্যরাতে জওহরলাল নেহরুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগে তাঁর এই কণ্ঠস্বর ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে।

৪. ১৯৪৭ সালের বক্স অফিসের হিট ঝড়:
স্বাধীনতার সেই মাহেন্দ্রক্ষণে ১৫ অগস্ট মুক্তি পায় পি এল সন্তোষীর ‘শেহনাই’। একই বছর মুক্তি পাওয়া দিলীপ কুমার ও নূর জাহানের ‘জুগনু’ অভিনেতার জীবনের প্রথম বড় হিট তকমা পায়। পাশাপাশি, রাজ কাপুর এবং মধুবালার পথচলা আরও পোক্ত হয় ‘নীল কমল’ ছবির হাত ধরে।

৫. আর.কে. ফিল্মস-এর প্রতিষ্ঠা (১৯৪৮):
মাত্র ২৪ বছর বয়সে রাজ কাপুর ‘আর কে ফিল্মস’ প্রতিষ্ঠা করে হিন্দি সিনেমার সবচেয়ে কনিষ্ঠ পরিচালক-প্রযোজক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এই স্টুডিওর লোগোটি তাঁদেরই অভিনীত ‘বারসাত’ ছবির পোস্টার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হয়েছিল। এই ব্যানারের প্রথম ছবি ‘আগ’-এর মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে পথচলা শুরু করেন রাজ কাপুর।

৬. সরকারি ‘ফিল্মস ডিভিশন’-এর প্রতিষ্ঠা (১৯৪৮):
বম্বেতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের অধীনে ‘ফিল্মস ডিভিশন’-এর প্রতিষ্ঠা ছিল স্বাধীন ভারতের প্রচার ব্যবস্থার অন্যতম বড় প্রাতিষ্ঠানিক মাইলফলক। সদ্য স্বাধীন ও দেশভাগের ক্ষতবিক্ষত ভারতের মানুষের কাছে সরকারি উন্নয়নমূলক বার্তা পৌঁছে দিতে প্রতিটি বাণিজ্যিক সিনেমা হলে ফিচার ফিল্মের আগে এর তথ্যচিত্র দেখানো আইনত বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।

৭. ‘চন্দ্রলেখা’ ছবির মুক্তি ও প্যান-ইন্ডিয়া সিনেমার সূচনা (১৯৪৮):
এস এস ভাসান পরিচালিত তামিল ছবি ‘চন্দ্রলেখা’ ভারতের আঞ্চলিক সিনেমার ধারণাকে ভেঙে প্রথম দেশব্যাপী ‘প্যান-ইন্ডিয়া’ ব্লকব্লাস্টারের জন্ম দেয়। তৎকালীন সময়ে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ছবির হিন্দি ডাবিং উত্তর ভারতে ঝড় তুলেছিল। আজকের বাহুবলী বা কেজিএফ-এর সাফল্যের আসল পথপ্রদর্শক ছিল এই ছবি।

৮. প্রথম চলচ্চিত্র অনুসন্ধান কমিটি গঠন (১৯৪৯):
সদ্য স্বাধীন দেশের সিনেমার পরিকাঠামো খতিয়ে দেখতে এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করতে জওহরলাল নেহরুর সরকার এস কে পাতিলের নেতৃত্বে এই উচ্চপর্যায়ে কমিটি গঠন করে। কমিটিতে বি এন সরকার এবং ভি শান্তারামের মতো দিকপাল ব্যক্তিত্বরা যুক্ত হয়েছিলেন।

৯. ‘ছিন্নমূল’ বাংলা সিনেমার ঐতিহাসিক মাইলফলক (১৯৫০):
নিমাই ঘোষ পরিচালিত বাংলা ছবি ‘ছিন্নমূল’ দেশভাগের ভয়াবহতা এবং উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে তৈরি প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র। শিয়ালদহ রেলওয়ে স্টেশন ও আসল রিফিউজি ক্যাম্পে কোনো পেশাদার মেকআপ ছাড়াই এই ছবির শুটিং হয়েছিল। গণনাট্য সংঘের আদর্শে তৈরি এই ছবিতে ঋত্বিক ঘটক অভিনেতা ও সহকারী পরিচালক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু করেন।