কাকদ্বীপে সিভিক ভলান্টিয়ারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে, তৃণমূল নেতৃত্বেও বিভাজন

দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপে এক সিভিক ভলান্টিয়ারের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতি ও যুবককে মারধরের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে চাপানউতোর শুরু হয়েছে। অভিযুক্ত বাপ্পা দাস কাকদ্বীপ থানায় কর্মরত একজন সিভিক ভলান্টিয়ার এবং নিজেকে কাকদ্বীপ ব্লক যুব তৃণমূলের সভাপতি হিসেবেও পরিচয় দেন। যদিও তাঁর এই পদ নিয়ে তৃণমূল নেতৃত্বেই দেখা দিয়েছে মতবিরোধ, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোরালো করে তুলেছে।
অভিযোগের ফিরিস্তি: পিডব্লিউডি জমি দখল থেকে জুয়ার আসর
স্থানীয় যুবক অভিজিৎ মণ্ডল এই সিভিক ভলান্টিয়ার বাপ্পা দাসের বিরুদ্ধে কাকদ্বীপ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিজিতের অভিযোগ, “বাপ্পা দাস সরকারি পিডব্লিউডির জায়গার উপর লোকেদের ঘরবাড়ি বানিয়ে সেখান থেকে টাকা নিচ্ছেন। গ্রামের দিকে বড় বড় গাছ কেটে বিক্রি করে টাকা নিচ্ছেন। বিভিন্ন ক্লাবের মধ্যে গোপনে রাতের অন্ধকারে টাকার বিনিময়ে জুয়া খেলায় সাহায্য করেন। তৃণমূল যুব কংগ্রেসের নামে ছেলেদের নিয়ে গুন্ডামি করে বেড়ান বাপ্পা। আর তার প্রতিবাদ করায় আমাকে রাস্তায় ফেলে মারধর করা হয়। আমি সুস্থ হয়ে থানায় অভিযোগ করি। তবে প্রশাসনের তরফে কোনও সাহায্য করা হয়নি।”
পুলিশি তদন্ত শুরু, রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন
অভিজিৎ মণ্ডলের এই অভিযোগ পাওয়ার পরই কাকদ্বীপ থানার পুলিশ বাপ্পা দাসের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। কাকদ্বীপের এসডিপিও প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “বাপ্পা দাস কাকদ্বীপ থানার সিভিক ভলান্টিয়ার। তাঁর বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ উঠেছে তা খতিয়ে দেখছে কাকদ্বীপ থানার পুলিশ।”
স্থানীয় সূত্রে খবর, বাপ্পা দাস কাকদ্বীপ তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রাক্তন সভাপতি এবং সুন্দরবন মহাবিদ্যালয়ের প্রাক্তন জিএস ছিলেন। তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলেও এই পদগুলির প্রমাণ মেলে। বিধায়ক মন্টুরাম পাখিড়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং স্নেহধন্য হিসেবেও তিনি পরিচিত, যার ফলে তাঁর ‘স্বৈরাচারিতা’ নিয়ে কেউ সহজে মুখ খুলতে সাহস পায় না বলে অভিযোগ।
বিরোধী দলগুলির আক্রমণ ও তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল
একই সঙ্গে তৃণমূলের যুব সভাপতি, সিভিক ভলান্টিয়ার এবং ঠিকাদার হিসেবে বাপ্পা দাস কীভাবে কাজ করতে পারেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিজেপি-সহ অন্যান্য বিরোধী দল। ডিওয়াইএফআই নেতা স্বপ্নময় সাহা বলেন, “তৃণমূলের সকল কর্মীরা সিভিক ভলান্টিয়ারের সঙ্গে যুক্ত। কাকদ্বীপ কলেজ থেকে শুরু করে কাকদ্বীপের গোটা এলাকায় বিভিন্ন অপকর্ম ঘটে চলেছে। আমরা চাই সঠিক তদন্ত হয়ে অভিযুক্তের শাস্তি হোক।” বিজেপি নেতা অরুণাভ দাস অভিযোগ করেন, বাপ্পা দাস প্রভাব খাটিয়ে সরকারি জায়গা অবৈধভাবে দখল থেকে শুরু করে জুয়া খেলা ও অন্যান্য অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত। তাঁরা অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, অভিযুক্ত সিভিক ভলান্টিয়ার বাপ্পা দাস অবশ্য সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমি সিভিক ভলান্টিয়ার হিসেবে কর্মরত এই কথা সত্যি। এছাড়াও আমি একটি সাইড ব্যবসা করি। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমি এই ঘটনার সঙ্গে কোনওভাবেই যুক্ত নই।”
তবে এই ঘটনায় তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন প্রকাশ্যে এসেছে। সাংসদ তথা তৃণমূল জেলা যুব সভাপতি বাপি হালদার দাবি করেছেন, “এখন কাকদ্বীপে কোনও সভাপতি ঘোষণা হয়নি। কে বা কারা সভাপতি হিসেবে নিজের পরিচয় দিচ্ছে তা আমার জানা নেই।” অথচ, সম্প্রতি তৃণমূলের একটি কর্মসূচিতে মঞ্চে বক্তব্য রাখার সময় কাকদ্বীপের বিধায়ক মন্টুরাম পাখিরাকে ব্লক তৃণমূল কংগ্রেসের যুব সভাপতি হিসেবে বাপ্পা দাসের নাম নিতে দেখা গিয়েছে। এই বৈপরীত্য ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে পৌঁছেছে।