‘কলকাতা থেকে নির্দেশেই সর্বনাশ!’ নন্দীগ্রামের ভরাডুবি নিয়ে কুণাল ঘোষের বিস্ফোরক মন্তব্যে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি

পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে ফের একবার চরম শোরগোল ফেলে দিয়েছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের কোন্দল। নন্দীগ্রামে দলের ভরাডুবি প্রসঙ্গে বিস্ফোরক মন্তব্য করে দলকে কাঠগড়ায় তুলেছেন তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ। তাঁর স্পষ্ট দাবি, নন্দীগ্রামে তৃণমূলের শোচনীয় অবস্থার জন্য দলের একাংশ নেতার খামখেয়ালি সিদ্ধান্তই দায়ী। কুণালের অভিযোগ, কলকাতার আরামদায়ক ঘরে বসে যাঁরা ভেবেছিলেন সামান্য অঙ্গুলিহেলনে সমস্ত জেলা নিয়ন্ত্রণ করবেন, তাঁদের ভুল নীতিই এই চরম ফল ডেকে এনেছে। স্থানীয় কর্মীদের লড়াইকে কোণঠাসা করে বাইরে থেকে কিছু বিশিষ্ট নেতাকে ওই অঞ্চলে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন তিনি।
কুণাল ঘোষের এই অভিযোগের নিশানা মূলত কাদের দিকে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক জল্পনা শুরু হয়েছে। কুণাল সরাসরি নাম না করে দাবি করেছেন যে, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তন্ময় ঘোষের মতো নেতাদের প্রার্থী বা নির্দিষ্ট দায়িত্বে নিয়ে আসার নেপথ্যে এক বিশেষ পরিকল্পনা ছিল। এমনকি তাঁর বিনা নোটিসে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে আই-প্যাক (I-PAC) বা অন্য কোনো সমান্তরাল শক্তির হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। যখন তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয় যে এই নির্দেশ কি সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে এসেছিল, তখন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে কুণাল মন্তব্য করেন যে, এই সমস্ত স্পর্শকাতর বিষয় খোলসা করার উপযুক্ত সময় এখনও আসেনি, তবে সঠিক সময় এলে সবটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে।
কুণালের এই বিস্ফোরক মন্তব্যের পরই আসরে নেমেছেন অভিযুক্ত নেতারা। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা বিজেপি থেকে তৃণমূলে ফেরা নেতা রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় পাল্টা সাফাই দিয়ে জানিয়েছেন যে, তাঁকে কোনোদিন নির্দিষ্ট কোনো বড় দায়িত্ব দিয়ে নন্দীগ্রামে পাঠানো হয়নি। বরং কুণালদা নিজে তাঁকে দু-একবার নির্বাচনী সভায় নিয়ে গিয়েছিলেন এবং লোকসভা নির্বাচনের সময় তিনি শুধুমাত্র দলের নির্দেশে তমলুক প্রার্থীকে জেতানোর জন্য যথাসাধ্য সাহায্য করেছিলেন। একইভাবে, কালীঘাটপন্থী তৃণমূল নেতা তন্ময় ঘোষও কুণালের দাবি উড়িয়ে দিয়ে বলেন যে, যখন তিনি পূর্ব মেদিনীপুরের দায়িত্বে ছিলেন, তখনকার পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফল সকলের সামনে রয়েছে। পরবর্তীতে দায়িত্ব বিভাজন হয়ে যাওয়ার পর কুণালদাই নন্দীগ্রাম দেখতেন এবং সেই সময় তিনি আর সেখানে হস্তক্ষেপ করেননি।
অন্যদিকে, তৃণমূলের অন্দরের এই গৃহযুদ্ধকে লুফে নিতে একটুও সময় নষ্ট করেনি বিরোধী দল বিজেপি। রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার কুণাল ঘোষের এই মন্তব্যকে কটাক্ষ করে বলেছেন যে, এটি সম্পূর্ণভাবে শাসকদলের অন্দরের ঘরোয়া বিষয়, তাই তারা যা খুশি বলতেই পারে। তবে তৃণমূল নামক রাজনৈতিক শক্তিটি এখন রাজ্যের মানুষের কাছে পরীক্ষিত এবং সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করে তিনি বলেন যে, এই ধরনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে বিজেপির বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। সবমিলিয়ে, লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের অনেক পরেও নন্দীগ্রামের পরাজয়ের ময়নাতদন্ত যে শাসকশিবিরের অন্দরে নতুন করে চরম অসন্তোষের বীজ বপন করেছে, তা এই ঘটনায় আরও একবার স্পষ্ট হয়ে গেল।