নয়াদিল্লি: গোটা দেশ যখন উৎসবের মেজাজে, তখন প্রতিটি বাড়িতে চলছে পুজো, যজ্ঞ এবং নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। আর এই সমস্ত কাজের জন্য একটি অপরিহার্য উপাদান হল কর্পূর (Camphor)। দেশলাইয়ের একটি কাঠি ছোঁয়াতেই এটি মুহূর্তের মধ্যে জ্বলে ওঠে এবং এর মিষ্টি সুগন্ধ চারপাশ ভরিয়ে তোলে।
কিন্তু আপনি কি কখনও ভেবে দেখেছেন, এই কর্পূর কীভাবে তৈরি হয়, এর উৎস কী এবং কেনই বা এটি এত সহজে জ্বলে ওঠে? কর্পূরের উৎস এবং এর চমকপ্রদ ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হলো।
কর্পূর কীভাবে তৈরি হয়?
বাজারে প্রধানত দুই ধরণের কর্পূর পাওয়া যায়: প্রাকৃতিক কর্পূর এবং কৃত্রিম কর্পূর (Synthetic Camphor), যা কারখানায় তৈরি হয়।
প্রাকৃতিক কর্পূর আসে একটি গাছ থেকে, যার বৈজ্ঞানিক নাম হলো Cinnamomum camphora। এই কর্পূর গাছটি প্রায় ৫০-৬০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। কর্পূর মূলত এই গাছের ছাল বা বাকল থেকে তৈরি হয়।
যখন গাছের ছাল শুকিয়ে বা ধূসর-বাদামি হতে শুরু করে, তখন তা গাছ থেকে তুলে নেওয়া হয়।
এরপর এই ছালকে উত্তপ্ত করা হয়, পরিশোধন করা হয় এবং তারপর গুঁড়ো করা হয়।
সবশেষে, এই গুঁড়ো বিভিন্ন আকারে তৈরি করে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়।
কর্পূর গাছের ইতিহাস ও ‘কালো সোনা’ রহস্য
বিশ্বাস করা হয়, কর্পূর গাছের উৎপত্তি পূর্ব এশিয়াতে, বিশেষত চিনে। নবম শতাব্দীর মধ্যেই পাতন প্রক্রিয়ায় কর্পূর তৈরির পদ্ধতি শুরু হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে এর ব্যবহার সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু ১৮ শতকের মধ্যে তাইওয়ান (তৎকালীন ফরমোসা) কর্পূর উৎপাদনের বৃহত্তম কেন্দ্রে পরিণত হয়। তখন চিনদেশের ছিং রাজবংশ এই গাছের ওপর কঠোর একচেটিয়া অধিকার তৈরি করেছিল। অনুমতি ছাড়া এই গাছ স্পর্শ করা ছিল গুরুতর অপরাধ। জানা যায়, ১৭২০ সালে এই নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য প্রায় ২০০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল!
কর্পূরের অত্যধিক মূল্যের কারণে কর্পূর গাছকে কখনও কখনও ‘কালো সোনা’ (Black Gold) বলেও উল্লেখ করা হয়। কারণ, এটি শুধুমাত্র ধর্মীয় আচারের জন্যই নয়, বরং মূল্যবান সুগন্ধি তেল, ওষুধ, পারফিউম এবং সাবান তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়।
কর্পূর এত সহজে কেন জ্বলে ওঠে?
কর্পূর খুব সহজে জ্বলে ওঠার পিছনে রয়েছে বিজ্ঞানসম্মত কারণ।
১. নিম্ন ইগনিশন তাপমাত্রা: কর্পূর তৈরি হয় উচ্চ পরিমাণে কার্বন এবং হাইড্রোজেন দিয়ে। এই উপাদানের কারণে এর ইগনিশন তাপমাত্রা (Ignition Temperature) অত্যন্ত কম থাকে। অর্থাৎ, আগুন লাগার জন্য খুব সামান্য তাপই যথেষ্ট।
২. দ্রুত বাষ্পীভবন: কর্পূর অত্যন্ত উদ্বায়ী (Highly Volatile)। সামান্য উত্তাপ পেলে এটি দ্রুত বাষ্পে পরিণত হয় এবং এই বাষ্প সহজেই বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে মিশে যায়। এই মিশ্রণটি খুব দ্রুত জ্বলে ওঠে।
এই সহজ বৈজ্ঞানিক কারণেই কর্পূর একটি দেশলাইয়ের স্পর্শে মুহূর্তের মধ্যে জ্বলে ওঠে এবং পবিত্র আভার সৃষ্টি করে।
আপনি কি পুজোর জন্য সবসময় প্রাকৃতিক কর্পূর ব্যবহার করেন? কমেন্ট করে জানান!