কণ্ঠস্বর বাঁচাতে ইতালির প্রধানমন্ত্রীর বড় পদক্ষেপ! AI জালিয়াতি রোধে ট্রেডমার্কের ঐতিহাসিক আবেদন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) যুগে প্রযুক্তির যেমন অভাবনীয় উন্নতি ঘটেছে, তেমনই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এর অপব্যবহার। বিশেষ করে ‘ডিপফেক’ (Deepfake)-এর ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে বিশ্বজুড়ে এখন চরম আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এই বিপজ্জনক ট্রেন্ডের বিরুদ্ধে এবার এক অনন্য ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিলেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিও মেলোনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নিজের কণ্ঠস্বর বা ভিডিওর যেকোনো ধরনের বেআইনি ও নকল অপব্যবহার রুখতে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অফিসে (EUIPO) নিজের কণ্ঠস্বর ট্রেডমার্ক করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানিয়েছেন।

ডিপফেক আসলে এমন এক প্রযুক্তি, যেখানে এআই-এর সাহায্য নিয়ে কোনো ব্যক্তির মুখমণ্ডল, কণ্ঠস্বর বা সম্পূর্ণ ভিডিওকে নিখুঁতভাবে নকল করে এমন এক বাস্তব রূপ দেওয়া হয়, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল ও মেকি বা নকলের ফারাক বোঝা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কম্পিউটার যখন ডিপ লার্নিং পদ্ধতির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ছবি ও শব্দের ডেটা নিয়ে কাজ করে, তখনই এই কৃত্রিম বিষয়বস্তু তৈরি হয়। বর্তমানে এই প্রযুক্তি এতটাই সহজলভ্য হয়ে উঠেছে যে, মাত্র তিন সেকেন্ডের কোনো ব্যক্তির আসল অডিও ক্লিপ এবং সামান্য ৩০ ইউরো খরচ করেই এমন নিখুঁত ভয়েস ক্লোনিং তৈরি করা সম্ভব, যা প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে।

অতীতে জর্জিও মেলোনি নিজেও এই ডিপফেক প্রযুক্তির শিকার হয়েছেন। তাঁর একটি ছবি বিকৃত করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার পর তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। নিজের আত্মজীবনীর নাম ‘আই সোনো জর্জিয়া’-র আদলে এবার তিনি মাত্র ৪ সেকেন্ডের একটি অডিও ক্লিপ জমা দিয়েছেন, যেখানে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “আমি জর্জিও মেলোনি।” যদি ইইউআইপিও (EUIPO)-র এই ট্রেডমার্ক আবেদনটি অনুমোদিত হয়, তবে আগামী ১০ বছরের জন্য ইউরোপজুড়ে তাঁর কণ্ঠস্বরের ওপর একচ্ছত্র আইনি অধিকার থাকবে। এর ফলে অনুমতি ছাড়া কেউ তাঁর কণ্ঠ বা ভিডিও ব্যবহার করে জালিয়াতি করতে পারবে না। ইতালিতে এর আগে গায়ক জিউসি ফেরেরি এবং অভিনেতা লুকা ওয়ার্ডও নিজেদের কণ্ঠস্বর ট্রেডমার্ক করে আইনি সুরক্ষা সুনিশ্চিত করেছেন।

ডিপফেকের এই থাবা কেবল ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং ভারতসহ সারা বিশ্বেই এর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ক্যাসপারস্কির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই-এর জেরে ভয়েস ক্লোনিং এবং জালিয়াতির ঘটনা হু হু করে বাড়ছে। খোদ ভারতের লোকসভা নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, রাহুল গান্ধী এবং অমিতাভ বচ্চনের মতো ব্যক্তিত্বদের ডিপফেক ভিডিও হোয়াটসঅ্যাপ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল, যা প্রতিরোধে নির্বাচন কমিশনকে পর্যন্ত বিশেষ নির্দেশিকা জারি করতে হয়েছিল। রাজনৈতিক ক্ষতিসাধন, ব্যক্তিগত ব্ল্যাকমেল এবং আর্থিক প্রতারণার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এই প্রযুক্তি। ডিজিটাল এই যুগে পাসপোর্টের মতো নিজের কণ্ঠ ও মুখাবয়ব রক্ষা করাও যে সমান জরুরি, মেলোনির এই পদক্ষেপে তা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠল।