কক্সবাজারের ইনানী বনে লুকিয়ে আছে অবাক করা রহস্য! গবেষকদের ক্যামেরায় ধরা পড়ল মহাবিপন্ন মেঘলা চিতা ও উল্লুক

কক্সবাজার শহর থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত ইনানী জাতীয় উদ্যান বর্তমানে দেশের বন্যপ্রাণী গবেষকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। উপকূলীয় পাহাড় ঘেরা এই সুবিশাল বনাঞ্চলে সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় ২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে। বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের পরিচালক বিপুল কৃষ্ণ দাসের পরিচালিত এই গবেষণায় মেঘলা চিতা এবং পশ্চিমের উল্লুকের মতো চরম সংকটাপন্ন ও বিরল প্রজাতির প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যা দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে এক বিশাল মাইলফলক।
২০১৯ সালে সরকার এই গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চলকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করলেও এর বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে এর আগে তেমন কোনো ব্যাপক গবেষণা হয়নি। গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাস আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির নিখুঁত প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। পুরো উদ্যানকে মোট ১১টি জোনে ভাগ করে ৩২টি নির্দিষ্ট স্থানে ক্যামেরা ট্র্যাপ বসানো হয়। পাশাপাশি লাইন ট্রানসেক্ট পদ্ধতি এবং প্রাণীদের পরোক্ষ চিহ্ন বা পায়ের ছাপ, বিষ্ঠা এবং গাছের আঁচড় বিশ্লেষণ করে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। বনের আশপাশে বসবাসকারী প্রায় তিনশ মানুষের সঙ্গে কথা বলেও বাস্তুতন্ত্রের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
এই গবেষণার মাধ্যমে ইনানী উদ্যানে যেসব স্তন্যপায়ী প্রাণীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে এশিয়ান হাতি, মায়া হরিণ, বনশূকর, পশ্চিমের উল্লুক গিবন, লাল বানর, মুখপোড়া হনুমান, বড় বাঘডাশ, মেছো বিড়াল, লেপার্ড ক্যাট, কাঁকড়াভুক বেজি, গন্ধগোকুল, সোনালি শিয়াল, মালয় শজারু এবং উড়ন্ত কাঠবিড়ালিসহ বিভিন্ন দুর্লভ প্রাণী। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চমক নিয়ে এসেছে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিরল প্রাণী মেঘলা চিতা বা ক্লাউডেড লেপার্ড। আইইউসিএন-এর লাল তালিকা অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী সংকটাপন্ন এই প্রাণীটিকে ক্যামেরায় বন্দী করার ঘটনা বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী গবেষণায় এই প্রথম।
গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাস জানিয়েছেন, ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে পাঁচটি মেঘলা চিতা সরাসরি ধরা পড়েছে এবং তাদের পায়ের ছাপ বা মলের মতো ১৩টি প্রমাণ মিলেছে। বিড়াল গোত্রের এই প্রাণীটি গাছে চড়তে অত্যন্ত পটু এবং দিনের বেশিরভাগ সময় গাছের মগডালেই কাটায়। তবে এমন সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের পরেও বনের সুরক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান জানান, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে পর্যাপ্ত বরাদ্দ, জনবল সংকট এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবের কারণে এই অমূল্য সম্পদগুলো এখনো চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।