“ওরা কোনো সাধু-সন্ত নয়!” ককরোচ জনতা পার্টির নেতাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে মুখ খুললেন সোনম ওয়াংচুক

দেশজুড়ে আলোচিত নিট প্রশ্নফাঁস বিতর্ক এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে রাজধানীর যন্তরমন্তরে যে দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার নেপথ্য রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে সম্প্রতি এক বিস্ফোরক মন্তব্য করে নতুন রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন বিশিষ্ট জলবায়ু আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক। প্রখর গুপ্তার একটি জনপ্রিয় পডকাস্টে অংশ নিয়ে তিনি ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এবং অন্যান্য তরুণ নেতাদের রাজনৈতিক অভিলাষ ও তাঁদের আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। যা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
উল্লেখ্য, কিছুদিন আগে নিট দুর্নীতি ও প্রশ্নফাঁসকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণের দাবিতে যন্তরমন্তরে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমরণ অনশন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করেছিলেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এবং তাঁর সহযোগী সৌরভ দাসেরা। পরবর্তী সময়ে পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকও নজরবন্দি দশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সেই আন্দোলনমঞ্চে যোগ দিয়ে অনশনে সামিল হন। তাঁর উপস্থিতি ওই আন্দোলনকে জাতীয় স্তরে এক বিশাল প্রচারের আলোয় নিয়ে আসে এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমে তা জোরালো জায়গা করে নেয়। যদিও পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটায় সোনম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয় এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডার হাত থেকে জল পান করে তিনি অনশন ভাঙেন। অন্যদিকে, সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় দীর্ঘ আলোচনার পর ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জোরালো হওয়ায় নিজের অনশন প্রত্যাহার করেন অভিজিৎ দিপকে। আন্দোলনের শুরু ও সমাপ্তির পদ্ধতি ভিন্ন হলেও এই দুই হাই-প্রোফাইল মুখ একে অপরের দীর্ঘকালীন সফরসঙ্গী হিসেবে আন্দোলনকে সফল করেছিলেন।
সাম্প্রতিক সেই পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে সোনম ওয়াংচুক স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, যন্তরমন্তরে ওই তরুণ নেতাদের সঙ্গে দিন কাটানোর সুবাদে তাঁর সুদৃঢ় ধারণা জন্মেছে যে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। তবে তিনি একে কোনো নেতিবাচক দিক হিসেবে দেখতে নারাজ। বরং তাঁর মতে, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং তিনি তরুণ প্রজন্মকে আরও বেশি করে মূলধারার রাজনীতিতে অংশ নিতে, নতুন দল গঠন করতে কিংবা রাজনৈতিক দলগুলিতে যোগ দিতে উৎসাহিতই করবেন। তিনি আরও জানান যে, সিজেপির নেতারা ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাছে কখনোই তাঁদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা সরাসরি স্বীকার না করলেও, কাছ থেকে তাঁদের কার্যকলাপ ও কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে তাঁর মনে হয়েছে যে তাঁরা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যহীন ‘সাধু-সন্ত’ নন।
৫৯ বছর বয়সি এই প্রবীণ জলবায়ু আন্দোলনকর্মী পডকাস্টে আরও স্বীকার করেন যে, তরুণ ছাত্রনেতাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে হাত মেলানোর কারণে তাঁকেও বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। বিশেষ করে সমালোচকরা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে অতীতে আম আদমি পার্টির (আপ) সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তবে এই অতীত সংযোগ নিয়ে তাঁর মনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা সংশয় কাজ করেনি বলেই তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন। সোনমের মতে, অতীতে কেউ যদি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে থাকেন, তবে তার ভিত্তিতে বর্তমানের কোনো আন্দোলনকে খাটো করে দেখা উচিত নয়।
তবে আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট পবিত্রতা রক্ষা করার বিষয়ে বরাবরই কড়া অবস্থান নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন ওয়াংচুক। তিনি প্রকাশ করেন যে, আন্দোলন চলাকালীন তিনি একাধিকবার মঞ্চের তরুণ নেতাদের বুঝিয়েছিলেন যে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকটা তরুণ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং আশাব্যঞ্জক হলেও, একটি গণআন্দোলনের পবিত্রতা এবং আদর্শগত সততা বজায় রাখা সবকিছুর ঊর্ধ্বে। আন্দোলনের মঞ্চকে ব্যক্তিগত বা দলীয় রাজনৈতিক সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার না করে তার মূল দাবিগুলোর ওপর আলোকপাত করাটাই আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করতেন তিনি। শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং পরীক্ষামূলক দুর্নীতি দমনের দাবিতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক সমীকরণ এবং সোনম ওয়াংচুকের এই খোলামেলা স্বীকারোক্তি আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন কোনো মোড় নেয় কি না, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা।