নীল গ্রহ পৃথিবীতে জলের উৎস কী? কোটি কোটি বছর ধরে এই রহস্যের জট খুলতে লড়াই চালাচ্ছিলেন বিজ্ঞানীরা। এতদিন ধারণা করা হতো, বাইরে থেকে আসা বরফশীতল উল্কাপিণ্ডের আঘাতেই পৃথিবীতে জল এসেছে। কিন্তু নাসার (NASA) সাম্প্রতিক এক গবেষণা এই ধারণাকে ওলটপালট করে দিয়েছে। নতুন তথ্য বলছে, পৃথিবীর বেশিরভাগ জল সম্ভবত কোনো মহাকাশীয় বস্তু থেকে আসেনি, বরং এটি গ্রহের মূল ভিত্তি (Core) থেকেই তৈরি হয়েছে।
রহস্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে চাঁদের মাটিতে
নাসার জনসন স্পেস সেন্টারের গবেষক টনি গারগানো-র নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা অ্যাপোলো মিশনের আনা চাঁদের মাটির নমুনা বিশ্লেষণ করেছেন। চাঁদ যেহেতু কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর প্রতিবেশী, তাই পৃথিবীর ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে গেছে তার নিখুঁত রেকর্ড লুকিয়ে আছে চাঁদের মাটির স্তরে বা ‘রেগোলিথ’-এ। পৃথিবীতে আবহাওয়া এবং টেকটোনিক পরিবর্তনের কারণে সেই ইতিহাসের ছাপ মুছে গেলেও চাঁদে তা এখনও টাটকা।
অক্সিজেন আইসোটোপ ও ‘আঙুলের ছাপ’
গবেষকরা ট্রিপল অক্সিজেন আইসোটোপ পরিমাপের একটি নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। তাঁরা দেখেছেন:
-
চাঁদের মাটিতে কার্বন সমৃদ্ধ উল্কাপিণ্ডের উপাদান মাত্র ১ শতাংশ।
-
উল্কাপিণ্ডগুলি যে পরিমাণ জল বহন করে, তা পৃথিবীর বিশাল জলরাশির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
-
আইসোটোপগুলো অনেকটা ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট’ বা আঙুলের ছাপের মতো কাজ করে, যা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে জল সরবরাহে উল্কাপিণ্ডের ভূমিকা ছিল খুবই সামান্য।
বিজ্ঞানীদের বক্তব্য: > ডঃ টনি গারগানোর মতে, চাঁদের রেগোলিথ হলো এমন এক বিরল আর্কাইভ যা দিয়ে কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীর আশেপাশে কী ঘটছিল তা ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এই গবেষণা প্রমাণ করছে যে পৃথিবীর জল সম্ভবত তার গঠনের সময় থেকেই ভেতরে সঞ্চিত ছিল।
ভবিষ্যৎ মিশনের গুরুত্ব
এই আবিষ্কার কেবল পৃথিবীর জন্য নয়, নাসার আগামী আর্টেমিস (Artemis) মিশনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাঁদের মেরু অঞ্চলের ছায়াবৃত বরফ এবং মাটি থেকে আরও নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হলে সৌরজগতের জন্মলগ্ন এবং জল সরবরাহের সঠিক ইতিহাস জানা যাবে।
৫০ বছর আগে অ্যাপোলোর আনা নমুনা আজও বিজ্ঞানীদের চমকে দিচ্ছে। আর্টেমিস মিশন যখন চাঁদের দক্ষিণ মেরু থেকে নতুন নমুনা আনবে, তখন মহাকাশ বিজ্ঞানের পাতায় আরও কত বড় রহস্যের উন্মোচন হবে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে বিশ্ব।