উত্তর ভারতে ফের ডানা মেলছে দুর্যোগ! টানা বৃষ্টি ও নদীর রোষে ভাসছে বহু জেলা, জারি চরম লাল সতর্কতা

দিল্লি-সহ সমগ্র উত্তর ভারতের একাধিক রাজ্যে বর্ষার বিদায়ের সময়েও আবহাওয়ার মেজাজ অত্যন্ত রুদ্র। লাগাতার ভারী বৃষ্টি এবং নদনদীগুলির জলস্তর হু হু করে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিহার ও উত্তরপ্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক ও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। একাধিক প্রধান নদী বর্তমানে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং জলমগ্ন হয়ে পড়েছে হাজার হাজার হেক্টর কৃষি জমি ও জনবসতিপূর্ণ এলাকা। এই ভয়ংকর পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে রাজ্য ও কেন্দ্র প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ বিতরণ শুরু করা হয়েছে। একইসঙ্গে আবহাওয়া দপ্তরের নতুন বুলেটিনে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ফের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস জারি করা হয়েছে।
বিহারে বন্যা পরিস্থিতির কথা বলতে গেলে, রাজ্যের প্রায় ১২টি জেলার ২২ লক্ষেরও বেশি মানুষ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সরাসরি শিকার হয়েছেন। গঙ্গা সহ বেশ কয়েকটি প্রধান নদীর জলস্তর বিপদসীমা অতিক্রম করে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত। যদিও সাম্প্রতিক কিছু রিপোর্টে গঙ্গার জলস্তর কোনো কোনো এলাকায় সামান্য কমতে শুরু করায় কিছুটা স্বস্তির হাওয়া মিলেছে, তবুও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সংকটজনক রয়েছে। দুর্গত এলাকায় প্রশাসনের নজরদারিতে ত্রাণের কাজ চলছে। কোথাও বোট বা নৌকার সাহায্যে আটকে থাকা মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও বানভাসী মানুষের জন্য কমিউনিটি কিচেন ও জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র খোলা হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রতিবেশী রাজ্য উত্তরপ্রদেশের অবস্থাও কম শোচনীয় নয়। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, রাজ্যের মোট ৩৭টি জেলায় বন্যার প্রকোপ মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যেই লক্ষ লক্ষ মানুষকে জলমগ্ন গ্রাম ও শহর থেকে নিরাপদ উঁচু জায়গায় সরিয়ে আনা হয়েছে। প্রশাসনের তরফে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ত্রাণশিবির স্থাপন, পর্যাপ্ত উদ্ধারকারী নৌকা ও এনডিআরএফ (NDRF) টিম মোতায়েন করা হয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ নিজে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করে স্থানীয় প্রশাসনকে কড়া নজরদারি ও দ্রুত সহায়তার নির্দেশ দিয়েছেন।
এরই মধ্যে ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর (IMD)-এর গত ৮ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে যে, পূর্ব উত্তরপ্রদেশের কিছু অংশে আজ ভারী বৃষ্টির প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ি রাজ্য উত্তরাখণ্ডেও আগামী ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হতে পারে। পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলে আগামী ১০ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উত্তরাখণ্ডে নতুন করে বৃষ্টির পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তার লাভ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকাগুলিতে বজ্রবিদ্যুৎ সহ ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে ভারী বৃষ্টির হলুদ ও কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
শুধু উত্তর ভারতই নয়, দেশের পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতেও বর্ষার সক্রিয়তা বজায় রয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৮ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এবং ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর বিহারে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে বিহারের কিছু অংশে ৮ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং সিকিমেও টানা বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা ও সিকিমের বেশ কিছু এলাকায় বজ্রপাত এবং সঙ্গে দমকা ঝোড়ো হাওয়ার জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
দক্ষিণ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের অবস্থাও একই রকম। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের একাধিক রাজ্যে আগামী কয়েকদিন বৃষ্টির দাপট বজায় থাকবে। অরুণাচল প্রদেশ, অসম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম এবং ত্রিপুরায় বিক্ষিপ্ত থেকে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে হাওয়া অফিস। এর ফলে পাহাড়ি অঞ্চলের ধস এবং নদী তীরবর্তী নিচু এলাকাগুলিতে নতুন করে জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে, উত্তর ও পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে বর্ষার রেশ এখনও কাটেনি। বিশেষ করে বন্যাকবলিত বিহার ও উত্তরপ্রদেশের নদীগুলির জলস্তরের ওপর অবিরাম নজরদারি রাখছে প্রশাসন। আবহাওয়া দপ্তরের এই নতুন সতর্কবার্তার পর সাধারণ মানুষকেও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।