ওষুধ ব্যবসায়ী খুনকাণ্ডে এল বিরাট মোড়! শ্বশুরকে মারতে ৬ লক্ষ টাকার সুপারি দিয়েছিলেন পুত্রবধূই?

কানপুরের কল্যাণপুর থানা এলাকার অভিজাত রতন অরবিট অ্যাপার্টমেন্টে ওষুধ ব্যবসায়ী বিনীত মিনোচা হত্যা মামলায় চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এনেছে পুলিশ। এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডে এবার নিহতের নিজের পুত্রবধূ শালুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্তে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, এই ঠান্ডা মাথার খুনের নেপথ্যে রয়েছে খোদ পুত্রবধূর গভীর ষড়যন্ত্র। এর আগে পুলিশ একটি রোমহর্ষক বন্দুকযুদ্ধের পর নিহতের প্রাক্তন পরিচারক বিশাল এবং তার এক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছিল। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে ডাকাতির তত্ত্ব সম্পূর্ণ খারিজ হয়ে গেছে। এর পরিবর্তে পারিবারিক কলহ এবং আর্থিক বিরোধের জেরে এই খুন করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে তদন্তকারীরা। সবথেকে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ৬ লক্ষ টাকার একটি সুপারি চুক্তি হয়েছিল, যার মধ্যে ২ লক্ষ টাকা অগ্রিমও দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে এই মামলাটির গভীরে পৌঁছাতে ধৃতদের লাগাতার জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।

ঘটনার দিন রতন অরবিট অ্যাপার্টমেন্টের ওই ফ্ল্যাটের ভেতরেই রহস্যজনকভাবে মৃতদেহ উদ্ধার হয় বিনীত মিনোচার। সেই সময় নিহতের ছেলে, পুত্রবধূ শালু এবং তাঁদের সন্তানরা বাড়ির বাইরে ছিলেন। দীর্ঘক্ষণ পর তাঁরা ফিরে এসে ফ্ল্যাটের ভেতরে বিনীতের রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখতে পান। ঘটনার খবর পেয়েই তৎক্ষণাৎ তদন্তে নামে পুলিশ। ফ্ল্যাটের আশপাশের সমস্ত সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা শুরু হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দুই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করতে দেখা যায়। পুলিশ তদন্ত করে জানতে পারে, তাদের মধ্যে একজনের নাম বিশাল, যে প্রায় ছয় বছর আগে বিনীতের বাড়িতেই পরিচারকের কাজ করত। পরবর্তীতে চুরির অভিযোগে তাকে কাজ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু চুরির দায়ে তাড়িয়ে দেওয়ার পরেও বিশাল অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে এই পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছিল। এমনকি ওই ফ্ল্যাটের একটি ডুপ্লিকেট চাবিও তার কাছে গোপনে রাখা ছিল। পরিবারের সদস্যরা ফ্ল্যাট থেকে বাইরে বেরোনোর ঠিক কিছুক্ষণ পরেই বিশাল তার সঙ্গীকে নিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর বিনীতের ঘরে ফেরার অপেক্ষায় তারা দীর্ঘক্ষণ ফ্ল্যাটের ভেতরেই লুকিয়ে বসে থাকে।

তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। পুলিশের দাবি, অভিযুক্ত দুজন এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ফ্ল্যাটের ভেতরে অপেক্ষা করেছিল। এরপর বিনীত ফ্ল্যাটে পৌঁছামাত্রই তাঁকে নির্মমভাবে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। পুলিশ যখন এই হত্যাকাণ্ডের কিনারা করতে মাঠে নামে, তখন এর নেপথ্যে পারিবারিক বিবাদ এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে আসে। পুলিশ সূত্রে খবর, পারিবারিক খরচ এবং টাকা-পয়সা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই পরিবারে প্রবল উত্তেজনা ও অশান্তি চলছিল। আর এই পারিবারিক বিবাদের চরম পরিণতি হিসেবেই মৃতের পুত্রবধূ শালু শ্বশুরকে সরাতে খুনের পরিকল্পনা কড়েন। বিনীতকে চিরতরে শেষ করার জন্য কুখ্যাত দুষ্কৃতীদের সঙ্গে মোট ছয় লক্ষ টাকার একটি চুক্তি হয়েছিল। এই চুক্তির চুক্তি অনুযায়ী, কাজ শুরুর আগেই দুই লক্ষ টাকা অগ্রিম এবং বাকি চার লক্ষ টাকা খুন সম্পন্ন হওয়ার পর দেওয়ার কথা ঠিক হয়েছিল। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, এই হত্যাকাণ্ডকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় একটি সাধারণ স্বাভাবিক মৃত্যু বা আকস্মিক দুর্ঘটনা হিসেবে সাজানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় বিনীতকে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে খুন করার কথা ছিল। যাতে পরবর্তীতে তাঁর এই মৃত্যুকে আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত (Heart Attack) বলে সহজেই চালিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু ঘটনার রাতে বিনীত ভুলবশত বাচ্চাদের ঘরে চলে যান। সেখানে আগে থেকেই ঘাপটি মেরে বসে থাকা বিশাল ও তার সহযোগী মুখোমুখি পড়ে যাওয়ায় সেই পুরনো পরিকল্পনা পুরোপুরি বদলে যায়। এরপর ধস্তাধস্তির জেরে অভিযুক্তরা পকেট থেকে ধারালো ছুরি বের করে বিনীতের ওপর চড়াও হয় এবং উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে তাঁকে খুন করে পালিয়ে যায়। ঘটনার পর প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের নাগাল পায়। এরপর ধুন্ধুমার বন্দুকযুদ্ধের পর বিশাল ও তার সহযোগীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রাপ্ত জোরালো সূত্রের ভিত্তিতেই পরবর্তীতে বিনীতের পুত্রবধূ শালুকে এই খুনের চক্রে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে জেল হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আরও অন্য কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।