মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক মহাপ্রলয়ের ইঙ্গিত। দীর্ঘ কয়েক দশকের শাসনের অবসান ঘটিয়ে চিরবিদায় নিলেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ্যে আসতেই গোটা ইরান জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। কিন্তু এই শোক কেবল কান্নায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং তেহরানের পবিত্র জামকারান মসজিদের চূড়ায় ওড়ানো হয়েছে ‘লাল পতাকা’। এই রক্তিম নিশান ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা সরাসরি ‘ন্যায়বিচার’ এবং ‘প্রতিশোধের’ ডাক হিসেবে গণ্য করা হয়। খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর এই পতাকা ওড়ানোয় বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা।
আয়াতোল্লা আলি খামেনেই কেবল ইরানের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না, তিনি ছিলেন শিয়া মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তাঁর মৃত্যুতে গোটা ইরান এখন থমথমে। রাস্তাঘাট জনশূন্য, বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা কেন্দ্র। তেহরানের সরকারি বার্তায় জানানো হয়েছে, দেশ এখন এক গভীর শোকের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তবে খামেনেই যে আদর্শ রেখে গেছেন, তা থেকে বিচ্যুত হবে না ইরান। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজর কাড়ছে মসজিদের সেই লাল পতাকা। এর আগে জেনারেল কাসেম সোলেমানির মৃত্যুর সময়ও এই পতাকা ওড়ানো হয়েছিল, যার পর মার্কিন ঘাঁটিতে আছড়ে পড়েছিল ইরানি মিসাইল। খামেনেইয়ের প্রয়াণে কি তবে ইরান কোনো বহিঃশত্রুর হাত দেখছে? নাকি এটি কেবল অভ্যন্তরীণ কোনো বার্তার ইঙ্গিত—তা নিয়ে ধন্দ তৈরি হয়েছে।
তেহরানের পক্ষ থেকে সামরিক বাহিনীকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। আকাশপথের নিরাপত্তায় বসানো হয়েছে অতিরিক্ত এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম। ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ডস (IRGC) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “নেতার প্রয়াণে দেশ শোকাহত ঠিকই, কিন্তু আমাদের হাত কামানের ওপর থেকে সরেনি।” এই বার্তা মূলত ইজরায়েল এবং পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি এক পরোক্ষ হুঁশিয়ারি বলে মনে করা হচ্ছে। খামেনেইয়ের উত্তরাধিকারী কে হবেন, তা নিয়ে যেমন জল্পনা চলছে, ঠিক তেমনই তাঁর প্রয়াণের পর মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ কতটা বদলে যাবে, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন ওয়াশিংটন।
খামেনেইয়ের প্রয়াণ সংবাদটি এমন এক সময়ে এল যখন ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে এক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তেহরানের রাজপথে এখন কেবল কালো পোশাকের ভিড় এবং লাউডস্পিকারে ভেসে আসা শোকগাথা। কিন্তু মসজিদের চূড়ায় পতপত করে ওড়া সেই লাল পতাকা মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ইরান হয়তো বড় কোনো পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী কয়েক দিন ইরানের জন্য তো বটেই, গোটা বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।