ইসলামিক শাসনের ভিত কি এবার টলমল? ইরানে সরকারের বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভ এখন এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। চারিদিকে শুধুই হাহাকার আর বারুদের গন্ধ। তেহরানের রাজপথ থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত প্রদেশ—সর্বত্রই এখন প্রতিবাদের সুর। আর এই গণবিদ্রোহ দমন করতে ইরান সরকার চরম পথ বেছে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিক্ষোভকারীদের সরাসরি বুকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে।
‘টাইম ম্যাগাজিন’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তেহরানের জনৈক অজ্ঞাতপরিচয় চিকিৎসক এক বিস্ফোরক দাবি করেছেন। তাঁর মতে, শুধুমাত্র তেহরানের ৬টি হাসপাতালেই অন্তত ২১৭ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়েছে। ওই চিকিৎসকের দাবি, নিরাপত্তা বাহিনী জমায়েত দেখলেই সরাসরি গুলিবর্ষণ করছে। নিহতদের মধ্যে সিংহভাগই তরুণ প্রজন্মের। এমনকি উত্তর তেহরানের একটি পুলিশ স্টেশনের বাইরে মেশিনগান দিয়ে ব্রাশফায়ার করারও অভিযোগ উঠেছে, যেখানে অন্তত ৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। যদিও টাইম ম্যাগাজিন এই মৃত্যুর সংখ্যা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারেনি।
ইরানের এই অস্থিরতার সূত্রপাত হয়েছিল গত ২৮ ডিসেম্বর। মূলত আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামলেও, তা দ্রুত রাজনৈতিক বিদ্রোহে রূপ নেয়। এখন বিক্ষোভকারীদের একটাই দাবি—বর্তমান ইসলামিক শাসনের অবসান এবং একনায়কতন্ত্রের পতন। ৩১টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলনে এখন ‘আজাদি’ বা স্বাধীনতার স্লোগান প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন দেশজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে এবং টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সংবাদমাধ্যমের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ জারি করেছে।
বিক্ষোভের আঁচ এতটাই তীব্র যে, তেহরানের আল রাসুল মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। তবে ওয়াশিংটন ভিত্তিক কিছু মানবাধিকার সংগঠনের মতে, নিহতের সংখ্যা এই মুহূর্তে ৬৩ জনের কাছাকাছি, যার মধ্যে ৪৯ জন সাধারণ নাগরিক। কিন্তু সরকারি কড়াকড়ির কারণে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মহলের ব্যাপক চাপ সত্ত্বেও নিজের অবস্থানে অনড় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান কোনো বহিঃশক্তির কাছে নতি স্বীকার করবে না। বিক্ষোভকারীদের ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী’ আখ্যা দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র কোনোভাবেই হার মানবে না। একদিকে সরকারের কড়া হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুপণ লড়াই—সব মিলিয়ে ইরান এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।