আসাদুজ্জামানকে ফেরাতে নয়া দিল্লির উপর চরম চাপ! হাসিনাকে বাঁচাতে ভারতের মাস্টারস্ট্রোক?

শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার চলতি মাসেই আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন নথিপত্র পাঠিয়েছে নয়াদিল্লির কাছে, যা নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলে নতুন করে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের তরফে সরকারিভাবে এই নথিপত্র প্রাপ্তির কথা স্বীকারও করে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সরকারি সূত্রের খবর অনুযায়ী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও দেশে ফিরিয়ে আনার জোরালো দাবি জানিয়ে দিল্লিকে চিঠি পাঠিয়েছে ঢাকা। উল্লেখ্য, শেখ হাসিনার সঙ্গেই একই চাঞ্চল্যকর মামলায় আসাদুজ্জামান খান কামালেরও মৃত্যুদণ্ডের সাজা ঘোষণা করেছে আদালত। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলিতে তিনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। হাসিনার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধেও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে সরাসরি যুক্ত থাকার গুরুতর অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছিল। ওই মামলায় মূল অভিযোগ আনা হয়েছিল যে, দেশজুড়ে চলা ছাত্র-জনতার আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করতে এবং আন্দোলনকারীদের ওপর নির্মমভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ সরাসরি দিয়েছিলেন কামাল নিজেই। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল উভয়কেই মৃত্যুদণ্ডের সাজা শোনান। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই তাঁরা উভয়েই দেশ ছেড়ে বর্তমানে পলাতক জীবন কাটাচ্ছেন।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির নাটকীয় মোড়ে শেখ হাসিনা নিজে থেকেই ঘোষণা করেছেন যে, তিনি আগামী মাস অর্থাৎ ডিসেম্বরেই নিজ দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হবেন এবং আইনানুগভাবে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করবেন। তবে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের এই বিষয়ে কী পরিকল্পনা রয়েছে, সে সম্পর্কে শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি। খোদ কামাল নিজেও এই স্পর্শকাতর বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রেখেছেন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে যে, সাবেক এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমানে গণমাধ্যম ও সর্বসমক্ষে মুখ খোলা সম্পূর্ণ বন্ধ রেখেছেন। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, তিনি মুখ খুললেই দেশে থাকা তাঁর পরিবার, পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনের ওপর রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং নির্যাতন মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষিত রাখার স্বার্থেই তিনি আপাতত স্বেচ্ছায় নীরব থাকার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে শেখ হাসিনার সঙ্গে তিনিও একই সময়ে স্বয়ং আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করবেন কিনা, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে এখনও ঘোর অনিশ্চয়তা ও ধন্দ বজায় রয়েছে।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও আইনি অবস্থান নিয়ে ভারত সরকারের মনোভাব ইতিমধ্যে অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যদিও নয়াদিল্লি সরাসরি সংবাদমাধ্যমের সামনে এই বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ, তবুও তাদের কথাবার্তায় এটি স্পষ্ট যে, প্রচলিত আইনি পথ অনুসরণ করে হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দিতে ভারত মোটেই আগ্রহী নয়। নয়াদিল্লির শীর্ষ মহলের জোরালো অভিমত হলো, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে শেখ হাসিনা কোনো সাধারণ বা পলাতক অপরাধী নন। কারণ বাংলাদেশের তৎকালীন সেনাবাহিনীর বিশেষ বিমান দিয়েই তাঁকে সুরক্ষার মধ্যে দিয়ে দিল্লিতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। ফলে তিনি বর্তমানে ভারতের মর্যাদাপূর্ণ অতিথি হিসেবেই অবস্থান করছেন। ভারতের সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক অবস্থান হলো, শেখ হাসিনা নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি কতদিন ভারতে থাকতে চান। ভারত সরকার পক্ষ থেকে তাঁকে কখনো এ দেশ ছেড়ে জোরপূর্বক চলে যেতে বলবে না।
তবে এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের আইনি কাঠামোর বিচারে তিনি একজন পলাতক আসামি, যিনি নিজের জীবন বাঁচাতে গোপনে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, তাঁকেও খুব সহজে বা কম সময়ে বাংলাদেশের হাতে প্রত্যর্পণ করা সম্ভব হবে না। ওয়াকিবহাল মহলের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য হলো, আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ একটি অত্যন্ত দীর্ঘসূত্রিতা ও জটিল আইনি প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে তাঁর বিচার কতটা নিরপেক্ষ ও ন্যায্য হয়েছে এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম সাজা দেওয়ার মতো অপরাধ তিনি আদতে করেছিলেন কিনা, এই সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয় গভীরভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করার পরই কেবল নয়াদিল্লিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে কোনো মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের কথা মাথায় রেখে বিশেষ ও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের কড়া নির্দেশ রয়েছে। সবমিলিয়ে এই দুই হেভিওয়েট নেতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ নিয়ে বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের কূটনীতি চরম মোড় নিয়েছে।