‘আমি কোনো বিতর্ক চাই না’, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র আক্রমণের মুখে নমনীয় অবস্থান নিলেন অভিষেক

তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক ‘দ্বন্দ্ব’ নিয়ে যখন রাজ্য রাজনীতি তোলপাড়, ঠিক তখনই এক নমনীয় ও সংযত অবস্থান নিলেন অভিষেক। গত কয়েকদিন ধরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে যে তীব্র বাচনিক আক্রমণ শানিয়েছিলেন শ্রীরামপুরের প্রবীণ সাংসদ, তার পাল্টা কোনো কড়া মন্তব্য না করে অভিষেক বরং সন্ধির ইঙ্গিতই দিলেন। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অভিষেক সাফ জানালেন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় দলের একজন প্রবীণ নেতা এবং তাঁর সমালোচনা করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। এ নিয়ে অযথা বিতর্ক সৃষ্টির কোনো কারণ নেই বলেই মনে করছেন তিনি।
অভিষেকের কথায়, “কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে বড় হতে দেখেছেন। তিনি দলের প্রবীণ নেতা এবং অভিভাবকতুল্য। তিনি আমার সমালোচনা করলে বা কোনো বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলে সেটাকে আমি ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে দেখছি না। দলের স্বার্থে তাঁর যে কোনো মন্তব্য করার অধিকার আছে।” তাঁর এই মন্তব্য যে দলের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা প্রশমিত করার জন্য একটি কৌশল, তা বলাই বাহুল্য।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল সই জাল সংক্রান্ত একটি মামলাকে কেন্দ্র করে। বিধানসভায় বিধায়কদের রেজোলিউশন বুক জমা দেওয়ার ঘটনায় অভিষেকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করছে সিআইডি। এই মামলায় প্রথম থেকেই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর পুত্র শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় আইনি লড়াই লড়ছিলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার আচমকাই নাটকীয় মোড় নেয় ঘটনাটি। বুধবার গভীর রাতে অভিষেকের পক্ষ থেকে মেসেজ করে জানানো হয়, এই মামলায় কল্যাণ বা তাঁর দলকে আর সওয়াল করতে হবে না। পরিবর্তে অয়ন ভট্টাচার্যকে আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ করা হয়। এই সিদ্ধান্তকেই চরম অপমানজনক বলে মনে করেছেন কল্যাণ।
অভিষেকের বিরুদ্ধে একের পর এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেন শ্রীরামপুরের সাংসদ। কল্যাণ সরাসরি বলেন, “অভিষেক নিজেকে দলের ‘বস’ মনে করেন। যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন অভিষেককে ছাড়া চলবে না, তবে আমি দল ছেড়ে দেব। আমাকে ডাস্টবিনের মতো ব্যবহার করা যাবে না।” শুধু তাই নয়, অভিষেককে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেন, “অহংকার আর ঔদ্ধত্য দলের সর্বনাশ ডেকে আনছে।” কল্যাণের এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই দলের অন্দরে অস্বস্তি বাড়ে।
এদিকে সিআইডির জোড়া নোটিশের মুখে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবারই সিআইডির একটি দল তাঁর বাড়িতে গিয়ে নোটিশ দিয়েছে। বিধায়কদের সই জাল সংক্রান্ত মামলার পাশাপাশি বিধানসভা নির্বাচনের আগে এক বিতর্কিত ভাষণের জন্য তাঁকে ভবানী ভবনে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে। আইনি লড়াই এবং দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাত—উভয় দিক থেকেই অভিষেক এখন চাপের মুখে।
অভিষেকের এই নমনীয়তা কি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মান ভাঙাতে পারবে? নাকি প্রবীণ এই আইনজীবীর অভিমান আরও দীর্ঘ হবে? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সামনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াই ও দলীয় কর্মসূচি থাকায় দলের প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই এখন অভিষেকের প্রধান লক্ষ্য। যদিও এই ‘ সন্ধির বার্তা’ সত্ত্বেও তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ কতটা স্বাভাবিক হয়, তা নিয়ে জল্পনা অব্যাহত। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় পরবর্তী সময়ে কী প্রতিক্রিয়া দেন, সেদিকেই তাকিয়ে দল ও রাজনৈতিক মহল।