“আপেলের সঙ্গে আপেলের তুলনা!”-GDP-বিতর্ক থামিয়ে কোন অজানা তথ্য ফাঁস করলেন পীযূষ গোয়েল?

ভারতের প্রথম ত্রৈমাসিকের জিডিপি বৃদ্ধির হার নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তরজা তুঙ্গে। পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচে বৃদ্ধির হার কি ৭.৮ শতাংশ নাকি মাত্র ২.৬ শতাংশ—তা নিয়ে শাসক ও বিরোধী শিবিরের যুক্তি-পাল্টা যুক্তির লড়াই চলছে। ঠিক এই আবহে কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের একটি মন্তব্য নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। জিডিপি সংক্রান্ত বিরোধী মতের বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি একটি ইংরেজি প্রবাদের সাহায্য নিয়ে বলেছেন, ‘Compare apples with apples’। কিন্তু জিডিপির মতো একটি জটিল অর্থনৈতিক বিষয় বোঝাতে তিনি কেন এই ধরনের ইংরেজি বাগধারার সাহায্য নিলেন, তা নিয়েই এখন শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা।

জিডিপি বিতর্কের আসল জায়গা কোথায়?
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের জিডিপি হিসাবের বেস ইয়ার বা ভিত্তি বছর বদলে ফেলা হয়েছে। ২০১১-১২ সালের পরিবর্তে এখন থেকে নতুন বেস ইয়ার ধরা হচ্ছে ২০২২-২৩ সালকে। কেন্দ্রের বক্তব্য, পুরোনো সিরিজের পরিসংখ্যানের সঙ্গে নতুন সিরিজের সরাসরি তুলনা করা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, ভারতের প্রাক্তন অর্থসচিব সুভাষচন্দ্র গর্গ দাবি করেছিলেন যে, গত বছরের জিডিপির পরিসংখ্যান নতুন করে সংশোধন না করা হলে চলতি বছরের বৃদ্ধির হার ২.৬ শতাংশে আটকে যেত। যদিও সরকারের তরফে পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রকের (MoSPI) সচিব সেই দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন। সরকারের পালটা যুক্তি, সম্পূর্ণ আলাদা দুটি সিরিজ, আলাদা বেস ইয়ার এবং রিয়েল ও নমিনাল জিডিপির হিসাব গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকার পদ্ধতির এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিক পরিসংখ্যানগত সংস্কার বললেও, বিরোধীরা তা মানতে নারাজ। আর ঠিক এই জায়গাতেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ‘apples with apples’ মন্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ স্পষ্ট হয়। তাঁর সাফ কথা, একই গোত্রের দুটি বিষয়ের মধ্যে তুলনা হতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়কে একাসনে বসানো চলে না।

আপেলের সঙ্গে আপেলের তুলনা! কী এই বাগধারা?
অর্থনীতির কঠিন হিসেব বাদ দিলে মন্ত্রীর বক্তব্য পরিষ্কার। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ‘apples with apples’ কি আদৌ কোনো সঠিক ইংরেজি বাগধারা? বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত আসল ইংরেজি প্রবাদটি হলো— ‘comparing apples and oranges’। যার সহজ বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির বিষয়ের তুলনা করা। কিন্তু এত ফল থাকতে আপেল এবং কমলাই কেন এই প্রবাদে জায়গা পেল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক তথ্য সামনে এসেছে।

ইন্টারনেটের তথ্য বলছে, ১৬-১৭ শতকে এই ধরনের বাগধারার প্রচলন থাকলেও সেখানে কমলালেবু ছিল না। তার পরিবর্তে ব্যবহৃত হতো ঝিনুক বা ‘ওস্টার’ (Oyster)। সেই সময় ‘Apple and Oyster’ উপমা বেশ জনপ্রিয় ছিল। পরবর্তীকালে সেই ঝিনুককে হটিয়ে জায়গা করে নেয় কমলালেবু। তথ্য বলছে, ‘comparing apples and oranges’ প্রবাদটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে মূলত বিংশ শতকের চারের ও পাঁচের দশকে।

দেশভেদে বদলে যায় ফলের নাম
ইংল্যান্ডের গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য দেশে গেলেই এই উপমায় ফলের নাম বদলে যায়। যেমন ফ্রান্সের ক্ষেত্রে একই অর্থ বোঝাতে ব্যবহার করা হয় ‘comparer des pommes et des poires’—যাঁর বাংলা করলে দাঁড়ায় আপেল ও নাশপাতির তুলনা। অর্থাৎ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা জিনিসকে এক করে দেখা। ইংরেজি ভাষাতেও এর সমার্থক হিসেবে ‘chalk and cheese’ বাগধারার প্রচলন রয়েছে। পোলিশ থেকে রাশিয়ান—বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন ফল বা উপমা দিয়ে এই একই অর্থ প্রকাশ করা হয়।

সাধারণ মানুষের কাছে জিডিপির এই গোলমেলে হিসাব বা আপেল-কমলার তত্ত্বে ঢোকা এক প্রকার অসম্ভব। সাধারণ মানুষ মূলত নিজেদের পকেট এবং মাসকাবারি বাজারের খরচের খাতার নিস্তিতেই দেশের অর্থনীতিকে মাপেন। তাই তাত্ত্বিক বিতর্কে ফলের নাম যাই হোক না কেন, আসল হিসেব যে সাধারণ মানুষের পকেটেই গিয়ে ঠেকে, সেটাই ধ্রুব সত্য।