আপনার নাম কি ভোটার তালিকা থেকে বাদ যেতে পারে? ‘ভোটচুরি’ বিতর্কের পর নির্বাচন কমিশন জানাল বিস্তারিত নিয়ম

রাহুল গান্ধী সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ করে ‘হাইড্রোজেন বোমা’ ফাটানোর দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ভুল মোবাইল নম্বর এবং ওটিপি ব্যবহার করে ভোটার তালিকা থেকে হাজার হাজার নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন (ECI) রাহুল গান্ধীর অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কমিশনের দাবি, অনলাইনে ভোটার বাদ দেওয়ার কোনো প্রযুক্তি নেই। ভারতের নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট এবং কঠোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই কাজ সম্পন্ন হয়।
ভারতের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫০ এবং রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেক্টর্স রুলস, ১৯৬০ অনুযায়ী ভোটার তালিকা থেকে কারও নাম বাদ দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে। এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় যাতে কোনো ব্যক্তির নাম ভুলভাবে তালিকা থেকে বাদ না যায়।
ফর্ম ৭ পূরণ: কোনো ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আবেদনকারীকে ফর্ম ৭ পূরণ করে ইলেক্টরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারের (ERO) কাছে জমা দিতে হয়। যদি কোনো ভোটার অন্য কেন্দ্রে চলে যান, তাহলে তিনি নিজেও এই ফর্ম পূরণ করতে পারেন।
প্রমাণপত্র জমা: নাম বাদ দেওয়ার জন্য আবেদনকারীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি ও প্রমাণ জমা দিতে হয়। যেমন—ভোটারের এপিক নম্বর, তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার যথার্থ কারণ, এবং আবেদনকারীর নিজস্ব বিবরণ ও স্বাক্ষর। যদি কোনো ভোটার অন্য কেন্দ্রে চলে যান, বা তার মৃত্যু হয়, তাহলে তার প্রমাণপত্রও দিতে হয়।
আবেদন যাচাই: আবেদন জমা হওয়ার পর ERO ওই ভোটারকে একটি নোটিশ পাঠায়। নোটিশে শুনানির তারিখ, সময় ও স্থান উল্লেখ করা থাকে। নোটিশটি রেজিস্টার্ড পোস্ট বা ওই ব্যক্তির ঠিকানায় সেঁটে দেওয়া হয়।
সরেজমিনে তদন্ত: এরপর বুথ লেভেল অফিসার (BLO) সরেজমিনে ওই ঠিকানায় যান এবং যাচাই করেন যে ওই ব্যক্তি সত্যি অন্য কোথাও চলে গেছেন, তার মৃত্যু হয়েছে, নাকি আবেদনটি মিথ্যা। BLO-এর দেওয়া রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ERO পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়।
শুনানি: যাচাই প্রক্রিয়া শেষে ERO আবেদনকারী এবং যার নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে, উভয়ের বক্তব্য শোনেন। প্রয়োজনে তিনি প্রমাণপত্র বা ব্যক্তিগত হাজিরার জন্য বলতে পারেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: সব সাক্ষ্য ও নথি বিবেচনা করে ERO আবেদনটি গ্রহণ বা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেন। যদি আবেদন গৃহীত হয়, তবে সেই ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ যায়।
রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেছিলেন যে একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, অনলাইন পোর্টালে শুধুমাত্র আবেদন জমা দেওয়া যায়, কিন্তু নাম বাদ দেওয়ার কোনো কারিগরি নেই। প্রতিটি আবেদনকে আইন অনুযায়ী ব্যক্তিগত ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যদি একসঙ্গে অনেক নাম বাদ দেওয়ার আবেদন জমা পড়ে, তাহলেও ব্যক্তিগত তদন্ত ছাড়া তা সম্ভব নয়।
যদি কেউ মিথ্যা তথ্য দিয়ে অন্য কারও নাম বাদ দেওয়ার জন্য আবেদন করেন, তাহলে জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী তার শাস্তি হতে পারে। অন্যদিকে, কোনো ভোটার যদি মনে করেন, ইচ্ছাকৃতভাবে তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাহলে তিনি নতুন করে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ফর্ম ৬ পূরণ করে আবেদন করতে পারেন।
এই কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করে যে, ভোটার তালিকা থেকে কোনো নাম বাদ দেওয়ার আগে সেই ব্যক্তি এবং আবেদনকারী দুজনেই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় অবগত থাকেন।