আধার কার্ডের পর এবার কি অপর আইডি নিয়ে বড় বিপত্তি? সুপ্রিম কোর্টের রায়ে দেশজুড়ে চাঞ্চল্য!

শিক্ষা জগতের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে সুপ্রিম কোর্ট ‘আপার আইডি’ বা ‘অ্যাপার আইডি’ (APAAR ID) সংক্রান্ত বিষয়ে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেছে। শীর্ষ আদালতের এই সাম্প্রতিক নির্দেশের ফলে গোটা দেশের কোটি কোটি স্কুল পড়ুয়া এবং অভিভাবক বড় ধরনের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পেরেছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা আইনি জল্পনা এবং গোপনীয়তা লঙ্ঘন সংক্রান্ত একাধিক বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই বিশেষ ইউনিক আইডি তৈরি করা কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক বা অনাবশ্যকভাবে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। এটি সম্পূর্ণভাবে একটি ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবেই বিবেচিত হবে। ওড়িশা হাইকোর্টের পূর্ববর্তী রায়কে বহাল রেখেই সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
পুরো বিষয়টি নিয়ে দেশের বিচারব্যবস্থায় বিগত বেশ কিছুদিন ধরেই বিতর্ক দানা বেঁধেছিল। আধার কার্ডের আদলে তৈরি এই অ্যাপার আইডি বাধ্যতামূলক করার বিরুদ্ধে আদালতে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছিল। আবেদনকারীদের প্রধান যুক্তি ছিল যে, ছোটো ছোটো স্কুল পড়ুয়াদের ব্যক্তিগত ডেটা এবং গোপনীয়তার অধিকার বা রাইট টু প্রাইভেসি এভাবে লঙ্ঘিত হতে পারে না। এই মামলার দীর্ঘ শুনানি শেষে বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, ছাত্রছাত্রীদের ডেটা সুরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়গুলিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। আদালত শুধু ওড়িশার হাইকোর্টের সিদ্ধান্তই কার্যকর রাখেনি, সেই সঙ্গে দেশের সমস্ত স্কুল ও শিক্ষা বোর্ডগুলিকে কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও নির্দেশ দিয়েছে।
উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান স্টুডেন্ট আইডি’ (One Nation, One Student ID) উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো এই অ্যাপার আইডি। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ১২ অঙ্কের একটি বিশেষ ডিজিটাল পরিচয়পত্র বা ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর প্রদান করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর সাহায্যে প্রি-প্রাইমারি থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি শিক্ষার্থীর সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ড, মার্কশিট, সার্টিফিকেট এবং স্কলারশিপের তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেসে সুরক্ষিত থাকার কথা। এর মূল উদ্দেশ্য হলো স্কুল ড্রপআউট বা শিক্ষাজীবন মাঝপথে ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা কঠোর হাতে রোধ করা এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করা।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সিবিএসই (CBSE) এবং দেশের অন্যান্য একাধিক স্টেট বোর্ড নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য বোর্ড পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে এই অ্যাপার আইডি তৈরি করা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছিল। বোর্ডগুলির স্পষ্ট নির্দেশ ছিল যে, এই ইউনিক আইডি ছাড়া কোনো পড়ুয়াই আগামী দিনে দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় বসতে পারবে না। এই একতরফা এবং বাধ্যতামূলক নিয়মের বিরুদ্ধে অভিভাবক মহলে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল। ফলস্বরূপ, মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের চৌকাঠে গড়ায় এবং আদালত বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে বড় পদক্ষেপ নেয়।
শীর্ষ আদালত তার পর্যবেক্ষণে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, অ্যাপার আইডি তৈরির সময় প্রতিটি শিক্ষার্থী বা তার অভিভাবকের স্পষ্ট এবং লিখিত সম্মতি থাকা বাধ্যতামূলক। ফর্ম পূরণের সময় ‘অপ্ট-আউট’ (Opt-out) বা এই প্রক্রিয়া থেকে স্পষ্টভাবে সরে আসার পূর্ণ সুযোগ বা বিকল্প থাকতে হবে। একই সঙ্গে, ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং ডেটা চুরির আশঙ্কা দূর করতে সিবিএসই ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কড়া নজরদারি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতের এই ঐতিহাসিক রায়ের ফলে একদিকে যেমন পড়ুয়াদের গোপনীয়তার অধিকার সুরক্ষিত হলো, তেমনই প্রশাসনিক নজরদারির ফাঁসে আটকে থাকা লাখ লাখ শিক্ষার্থীর দুশ্চিন্তাও অনেকটাই কমল।