আইপিও-র বাজারে ঐতিহাসিক সুনামি! কোন ১০টি শেয়ারে টাকা ঢালতে হুড়হুড়ি পড়ে গেল বিনিয়োগকারীদের?

ভারতীয় শেয়ার বাজারের প্রাথমিক বাজারের জন্য আগস্ট মাসটি একটি অত্যন্ত ঐতিহাসিক ও রেকর্ড ভাঙা অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বাজারের বর্তমান অস্থিরতা এবং নানা বৈশ্বিক উদ্বেগকে পুরোপুরি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং বা আইপিও নিয়ে এক অভূতপূর্ব ও পাগলাটে উৎসাহ লক্ষ্য করা গেছে। ইকোনমিক টাইমসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত এই এক মাসেই বাজারে আসা অন্তত ১০টি ভিন্ন আইপিও ১০০ গুণেরও বেশি সাবস্ক্রিপশন বিড অর্জন করেছে। খুচরা বিনিয়োগকারী, উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি তথা এইচএনআই (HNI) এবং যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা বা কিউআইবি (QIB)-দের সম্মিলিত তারল্যের ঢলে বেশিরভাগ কোম্পানির ইস্যু তাদের নির্ধারিত কোটার চেয়ে কয়েকশ গুণ বেশি সাবস্ক্রাইব হয়েছে। কর্পোরেট খাতের শক্তিশালী ব্যালেন্স শিট, আকর্ষণীয় মূল্যায়ন এবং তালিকাভুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই মোটা লাভের আশায় বিনিয়োগকারীদের এই ঐতিহাসিক উন্মাদনা আইপিও বাজারকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এসএমই (SME) এবং মেইনবোর্ড—উভয়ক্ষেত্রেই বিনিয়োগকারীদের এমন ব্যাপক অংশগ্রহণ স্পষ্ট করে দেয় যে, বর্তমান দেশীয় মূলধনের জোরালো প্রবাহ সরাসরি ভারতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিকে আরও শক্তিশালী করতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিএসই (BSE) এবং এনএসই (NSE)-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আইপিও সাবস্ক্রিপশনের গতিপ্রকৃতির দিক থেকে আগস্ট মাসটি বিগত প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী মাস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই মাসে বাজারে আসা মোট ২৩টি ইস্যুর মধ্যে দশটিতেই অফারে থাকা শেয়ার সংখ্যার ১০০ গুণেরও বেশি অবিশ্বাস্য বিড পাওয়া গেছে, যা ২০০৬ সালের পর এক মাসে সর্বোচ্চ রেকর্ডের নজির গড়েছে। এই অভাবনীয় সাফল্যের দৌড়ে সবার শীর্ষে অবস্থান করছে হাই-টেক ইঞ্জিনিয়ার্স, যারা অফারে থাকা মোট শেয়ার সংখ্যার ২৪৪.৪১ গুণ বিড সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। এর ঠিক পরেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান দখল করেছে যথাক্রমে টেম্পসেন্স ইনস্ট্রুমেন্টস ইন্ডিয়া (১৮৩.৫৩ গুণ) এবং ইএসডিএস সফটওয়্যার সলিউশনস (১৩৫.৮৮ গুণ)। এই মাসে ১০০ গুণের বেশি সাবস্ক্রাইব হওয়া অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় আইপিওগুলোর তালিকায় অত্যন্ত গৌরবজনকভাবে নাম লিখিয়েছে আর্ডি ইন্ডাস্ট্রিজ, লুমিনো ইন্ডাস্ট্রিজ, অগমন্ট এন্টারপ্রাইজেস, বিহারী লাল ইঞ্জিনিয়ারিং, সানশাইন পিকচার্স, শিপরকেট এবং প্রায়োরিটি জুয়েলস-এর মতো সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলি। সাবস্ক্রিপশনের এই বিশাল জোয়ার সাম্প্রতিক অতীতে বিগত মাসগুলির সমস্ত পূর্ববর্তী রেকর্ডকে বহু পেছনে ফেলে দিয়েছে। তুলনামূলকভাবে বিচার করলে দেখা যায় যে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যেখানে মাত্র সাতটি আইপিও ১০০ গুণের গণ্ডি পার করেছিল, আর ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে এমন আইপিও-র সংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচটি, সেখানে আগস্ট মাসের এই অর্জন এককথায় অতুলনীয়।
এই অবিশ্বাস্য প্রবণতা এবং রেকর্ড ওভারসাবস্ক্রিপশনের পেছনে একাধিক শক্তিশালী কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, ১০০ গুণেরও বেশি রেকর্ড ওভারসাবস্ক্রিপশন প্রমাণ করে যে বাজারে পুঁজির কোনো কমতি নেই। দ্বিতীয়ত, তালিকাভুক্তির পর উচ্চতর লাভের প্রত্যাশায় খুচরা এবং উচ্চবিত্ত বা এইচএনআই কোটায় রেকর্ড সংখ্যক আবেদন জমা পড়ে, যার ফলে বহু ছোট ও মাঝারি আকারের শেয়ার বরাদ্দের আগেই ব্লকবাস্টারে পরিণত হয়। তৃতীয়ত, কোয়ালিফায়েড ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক বা কিউআইবি (QIB)-দের কাছ থেকে পাওয়া জোরালো প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন বাজারকে আরও চাঙ্গা করে তোলে; কেবল দেশীয় খুচরা বিনিয়োগকারীরাই নন, বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারী (FPI) এবং শীর্ষস্থানীয় মিউচুয়াল ফান্ডগুলোও সম্ভাবনাময় কোয়ালিটি কোম্পানিগুলোতে আগ্রাসীভাবে দর হাঁকে। চতুর্থত, আগস্ট মাসের এই শক্তিশালী এবং রেকর্ড ভাঙা পারফরম্যান্স সেপ্টেম্বর মাস এবং আগামী দিনে বাজারে আসতে চলা একাধিক বড় ও মেগা মেইনবোর্ড আইপিওগুলোর জন্য অত্যন্ত অনুকূল ও শক্তিশালী বিনিয়োগ পরিবেশ প্রস্তুত করে দিয়েছে।
আগস্ট মাসের এই আকস্মিক ও অভাবনীয় বৃদ্ধি ২০২৬ সালে ১০০ গুণ ওভারসাবস্ক্রাইব হওয়া আইপিও-র মোট সংখ্যাকে একলাফে ১৫টিতে উন্নীত করেছে, যা ইতোমধ্যেই বিগত বছরের তুলনায় তৃতীয় সর্বোচ্চ পরিসংখ্যান হিসেবে রেকর্ড বইয়ে জায়গা করে নিয়েছে। যদি আমরা পূর্ববর্তী বছরগুলির ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই, তবে দেখা যাবে যে গত জুলাই মাসে তিনটি ইস্যু ১০০ গুণের সাবস্ক্রিপশন গণ্ডি অতিক্রম করেছিল, যেখানে জুন মাসে মাত্র দুটি কোম্পানি এই বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেছিল। চলতি বছরের শুরুতে, অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে ভারত কোকিং কোল একমাত্র আইপিও হিসেবে এই অনন্য কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছিল। তবে সাবস্ক্রিপশনের প্রতি বিনিয়োগকারীদের এমন প্রবল ও উন্মাদনামূলক আগ্রহ সর্বশেষ সবচেয়ে বেশি দেখা গিয়েছিল ২০২৪ সালে, যে বছর বাজারে চালু হওয়া মোট ৯১টি আইপিও-র মধ্যে ২৩টিই ১০০ গুণের বেশি ওভারসাবস্ক্রাইব হয়েছিল। এছাড়া ২০২১ সালে ৬৩টি ইস্যুর মধ্যে ১৭টি এই মাইলফলক স্পর্শ করেছিল, আর ২০২৫ সাল—যা আইপিও-র মাধ্যমে কর্পোরেট তহবিল সংগ্রহের দিক থেকে একটি সর্বকালীন রেকর্ড গড়া বছর ছিল—সেখানে মোট ১০৩টি চালু হওয়া আইপিও-র মধ্যে ১৫টি অফারে থাকা শেয়ার সংখ্যার ১০০ গুণেরও বেশি জোরালো বিড পেয়েছিল। বলাই বাহুল্য, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রাথমিক বাজারের এই দীপ্তিমান সাফল্য সামগ্রিক ভারতীয় পুঁজিবাজারের অদম্য শক্তি ও বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান আস্থারই এক উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ।