‘অমানবিক’ পুলিশি আচরণ! প্রাক্তন বিধায়ক শওকত মোল্লার মামলায় বড় রায় হাইকোর্টের

ক্যানিং পূর্বের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক শওকত মোল্লাকে ঘিরে চলা বিতর্কিত পুলিশি আচরণের ওপর এবার রাশ টানল কলকাতা হাইকোর্ট। মানবিক কারণে অভিযুক্ত শওকতকে কোমরে দড়ি পরিয়ে এলাকায় বা বাজারে ঘোরানো বা ‘প্যারেড’ করানো অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য। একইসঙ্গে, ধর্ষণকাণ্ডে অভিযুক্ত শওকত মোল্লার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলাগুলি খারিজ করার যে আবেদন তিনি জানিয়েছিলেন, তাও এদিন খারিজ করে দিয়েছে আদালত।

উল্লেখ্য, গত ৩ জুলাই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন শওকত মোল্লা। তাঁর আইনজীবীর দাবি ছিল, গত ২ জুলাই একটি ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত শওকতকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং এলাকার জীবনতলা বাজারের মধ্য দিয়ে যেভাবে পুলিশ হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, তা অমানবিক এবং বেআইনি। অপরাধের স্থান পুনর্গঠন বা ‘রিকনস্ট্রাকশন’-এর নাম করে পুলিশ যে আচরণ করেছে, তা অভিযুক্তের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছে বলে দাবি তোলা হয়। এছাড়া, শওকতের আইনজীবীর পক্ষ থেকে জেলে থাকাকালীন অন্য মামলায় পুনরায় গ্রেফতারি বন্ধেরও আর্জি জানানো হয়েছিল।

বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, শওকত মোল্লার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ রয়েছে। এই অবস্থায় মামলাগুলি খারিজ করা আদালতের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে অভিযুক্তের প্রাপ্য আইনানুগ অধিকারের বিষয়ে তিনি সরব হয়েছেন। বিচারপতির কথায়, “গ্রেফতারির পর থেকে পুলিশ যেভাবে এলাকায় অভিযুক্তকে ঘোরানোর ট্রেন্ড তৈরি করেছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত। বিচার হবে আইন মেনে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে কাউকে অমানবিক পরিস্থিতিতে পড়তে হবে।”

প্রসঙ্গত, সাত বছর আগের একটি ধর্ষণ মামলায় জীবনতলা থানার পুলিশ শওকত মোল্লাকে গ্রেফতার করেছে। এর আগে বিস্ফোরণ সংক্রান্ত একটি মামলায় এনআইএ (NIA)-এর হাতেও গ্রেফতার হয়েছিলেন এই প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক। বর্তমানে রাজ্যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে বেশ কয়েকজন প্রাক্তন শাসকদলীয় নেতার গ্রেফতারির সময় কোমরে দড়ি বেঁধে এলাকায় ঘোরানোর ছবি বারবার সামনে এসেছে, যা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক চলছে।

এর আগে গত ৫ জুন, এই ‘কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানো’-র বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলাও দায়ের হয়েছিল। বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত এবং বিচারপতি স্মিতা দাস দের গ্রীষ্মাবকাশকালীন ডিভিশন বেঞ্চ সেই সময় রাজ্য সরকারকে এই ধরণের আচরণের কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছিল। কোন পরিস্থিতিতে বা আইনের কোন ধারাবলে ধৃতদের এমনভাবে রাস্তায় হাঁটানো হচ্ছে, তা নিয়ে তিন সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট চেয়েছিল আদালত। সেই মামলার রেশ কাটতে না কাটতেই শওকত মোল্লার মামলাটি ফের ইস্যুটিকে প্রকাশ্যে আনল।

আইনজীবীদের একাংশের মতে, বিচারপতির এই পর্যবেক্ষণ আগামী দিনে পুলিশি কার্যপদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। অভিযুক্তের অপরাধ যাই হোক না কেন, বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং মানবিক মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখা যে সমান গুরুত্বপূর্ণ, আজকের নির্দেশে সেই বার্তাই দেওয়া হলো। শওকতের মামলাটি এখন অন্য আদালতে স্থানান্তরের পথ খোলা থাকলেও, আপাতত হাইকোর্টের এই নির্দেশ অভিযুক্তের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক বলে মনে করা হচ্ছে।