সম্পর্কের টানাপোড়েন, চিকিৎসার বিপুল খরচ আর এক দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটল কলকাতা হাইকোর্টের এজলাসে। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর উত্তর কলকাতার এক মহিলা হাসপাতালের চার দেওয়াল ছাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের বাড়িতে ফেরার অনুমতি পেলেন। তবে এই প্রত্যাবর্তনের পিছনে লুকিয়ে আছে এক মর্মান্তিক ও জটিল কাহিনী। ১ কোটি ৯ লক্ষ টাকার পর্বতপ্রমাণ বিল মকুব করে আদালত ওই মহিলার স্বামীকে নির্দেশ দিয়েছে স্ত্রীকে অবিলম্বে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। উত্তর কলকাতার বাসিন্দা ওই মহিলা তাঁর স্বামীর মোটরসাইকেলের পিছনে বসে যাওয়ার সময় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। মাথায় গুরুতর চোট নিয়ে তাঁকে বাইপাস সংলগ্ন অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ভর্তির সময় মাত্র ১৫ হাজার টাকা জমা দিয়েছিলেন স্বামী। এরপর বিমার ৫ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়ে গেলেও স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার বিশেষ উন্নতি হয়নি। দিন যত গড়িয়েছে, হাসপাতালের বিল পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। অভিযোগ, বিপুল খরচের ভার বইতে না পেরে এক সময় স্ত্রীকে হাসপাতালেই ফেলে চলে যান স্বামী।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, মহিলার চিকিৎসার জন্য একাধিক অস্ত্রোপচার করা হয়েছে এবং এ যাবৎ প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিল পরিশোধ না হওয়ায় এবং পরিবার রোগীকে নিয়ে যেতে অস্বীকার করায় শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হয় বেসরকারি হাসপাতালটি। অন্যদিকে, স্বামীর পালটা অভিযোগ ছিল যে হাসপাতাল সঠিক চিকিৎসা করেনি বলেই তাঁর স্ত্রীর এই অবস্থা।
বিচারপতি কৃষ্ণা রাও এই মামলার গুরুত্ব বুঝে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল গঠন করে মহিলার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই বিশেষজ্ঞ দল রিপোর্ট দেয় যে, মহিলা বর্তমানে স্থিতিশীল এবং বাড়িতে রেখে প্রয়োজনীয় শুশ্রূষা করলেই তিনি সুস্থ থাকবেন। আজ সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই বিচারপতি নির্দেশ দেন যে, স্ত্রীকে আর হাসপাতালে ফেলে রাখা চলবে না।
আদালত মানবিক দিক বিবেচনা করে মহিলার ১ কোটি ৯ লক্ষ টাকার বকেয়া বিল সম্পূর্ণ মকুব করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে এই সুবিধা যাতে অন্য কেউ অপব্যবহার করতে না পারে, তাই আদালত স্পষ্ট করেছে যে এটি কোনো ‘সার্বজনীন নির্দেশ’ নয়, বরং একটি বিশেষ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত। এছাড়া রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ওই মহিলাকে একটি বিনামূল্যে হুইলচেয়ার প্রদান করতে। পাঁচ বছর পর হুইলচেয়ারে বসেই নিজের ঘরে ফিরছেন সেই অভাগী স্ত্রী, যার জন্য হয়তো অপেক্ষা করে ছিল এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।





