সময়টা ছিল ২০১৪ সালের ৮ নভেম্বর। ছত্তিশগড়ের বিলাসপুর জেলায় সরকারি এক বন্ধ্যাত্বকরণ শিবিরে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন শয়ে শয়ে আদিবাসী ও গরিব মহিলা। কিন্তু কে জানত, সরকারের ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ’ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে এক ভয়াবহ মৃত্যুমিছিলের সাক্ষী হবে গোটা দেশ! দীর্ঘ ১২ বছরের আইনি লড়াই শেষে অবশেষে সেই নারকীয় ঘটনার অন্যতম কারিগর, সার্জন আর.কে. গুপ্তাকে জেলের সাজা শোনাল আদালত।
সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল? গ্রামাঞ্চলের একটি পরিত্যক্ত এবং অপরিচ্ছন্ন ভবনে ওই বন্ধ্যাত্বকরণ ক্যাম্প আয়োজন করা হয়েছিল। তদন্তে উঠে আসা তথ্যগুলো যে কোনো মানুষের গায়ের লোম খাড়া করে দেওয়ার মতো:
-
রেকর্ড গড়ার নেশা: জেলা হাসপাতালের সিনিয়র সার্জন আর.কে. গুপ্তা মাত্র ৯০ মিনিটের মধ্যে ৮৩ জন মহিলার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছিলেন। অর্থাৎ প্রতিটি অপারেশনে সময় দিয়েছিলেন মেরেকেটে এক থেকে দেড় মিনিট!
-
সরঞ্জামের অভাব: অভিযোগ ওঠে, একটি মাত্র ল্যাপারোস্কোপ মেশিন দিয়েই সবার অস্ত্রোপচার করা হয় এবং প্রতিটি অপারেশনের পর তা ঠিকমতো জীবাণুমুক্ত (Sterilize) করা হয়নি।
-
ভয়াবহ পরিণতি: অস্ত্রোপচারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মহিলারা বমি ও অসহ্য পেটে ব্যথার অভিযোগ শুরু করেন। একে একে ১৫ জন মহিলার মৃত্যু হয় এবং ৭০ জনেরও বেশি গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
ডাক্তারের সাফাই ও বিচার সেই সময় ছত্তিশগড় সরকার এই চিকিৎসককে রেকর্ড পরিমাণ অস্ত্রোপচারের জন্য পুরস্কৃত করেছিল। গ্রেপ্তারের পর আর.কে. গুপ্তা দাবি করেছিলেন, “প্রশাসন আমাকে টার্গেট পূরণের জন্য চাপ দিয়েছিল। আমি নির্দোষ, ওষুধের সমস্যার কারণে এই মৃত্যু হয়েছে।” তবে ফরেনসিক রিপোর্টে দেখা যায়, নোংরা পরিবেশে অস্ত্রোপচার এবং একই গ্লাভস ও সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহারের ফলেই মহিলাদের শরীরে মারণ সংক্রমণ (Sepsis) ছড়িয়ে পড়েছিল।
আদালত এই ঘটনাকে ‘বিরল অবহেলা’ হিসেবে গণ্য করে অভিযুক্ত চিকিৎসককে দোষী সাব্যস্ত করেছে এবং জেলের সাজা শুনিয়েছে।
সম্পাদকের নোট: সরকারি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে নিরীহ মানুষের প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই ঘটনা জনস্বাস্থ্যের পরিকাঠামো নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল। এক যুগ পর আদালতের এই রায় কি নিহতদের পরিবারকে শান্তি দিতে পারবে?