হরমুজ সঙ্কটে বিশ্ববাজারে গ্যাসের হাহাকার! ভারতের জন্য সুখবর না কি বড় চ্যালেঞ্জ? জানুন আসল সত্যি

পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে গত তিন মাস ধরে কার্যত অচল হরমুজ প্রণালী। এই পরিস্থিতির ফলে বিশ্বজুড়ে লিক্যুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস (LNG) বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সঙ্কটের প্রভাবে আগামী অগস্টের মধ্যে বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ওপর আবহাওয়ার পূর্বাভাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, চলতি বছরে ভারতসহ গোটা এশিয়ায় তীব্র গ্রীষ্মের সম্ভাবনা রয়েছে। জুন থেকে অগস্ট মাস পর্যন্ত এল নিনোর প্রভাবে তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই গরম বাড়লে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার আকাশছোঁয়া হবে, যা বিদ্যুৎ চাহিদাকে বাড়িয়ে তুলবে। এই পরিস্থিতি এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে চিনসহ বেশ কিছু দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যাপকভাবে এলএনজি-র ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে তাদের গ্যাসের আমদানিও বাড়াতে হবে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওপর মারাত্মক চাপ পড়বে। ইতিমধ্যেই গত বছরের তুলনায় এলএনজি সরবরাহ ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

ভারতের ক্ষেত্রে অবশ্য ছবিটা অনেকটাই আশাব্যঞ্জক। তথ্যানুসারে, ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র ৪ শতাংশেরও কম এলএনজি-র ওপর নির্ভরশীল। ভারতে বিদ্যুতের প্রয়োজনের সিংহভাগ, অর্থাৎ ৬৯ থেকে ৭২ শতাংশই কয়লা থেকে মেটানো হয়। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকাঠামোর ৪২ থেকে ৪৭ শতাংশ তাপবিদ্যুতের দখলে। ভারতের অচিরাচরিত শক্তি বা রিনিউয়েবল এনার্জি সেক্টরও ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে, যা দেশের মোট প্রয়োজনের প্রায় ২৮ শতাংশ বিদ্যুৎ জোগান দিচ্ছে। এই সেক্টরের আওতায় সৌর বিদ্যুৎ থেকে ২৮.৭ শতাংশ, বায়ু শক্তি থেকে ১০.৫ শতাংশ এবং জলবিদ্যুৎ থেকে ৯.৬ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১.৬ শতাংশ এবং তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে উৎপন্ন বিদ্যুতের হার মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ।

সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি-র দাম বাড়লেও ভারত তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। চিনের মতো দেশগুলো যখন গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে চরম সঙ্কটে পড়বে, তখন ভারতের কয়লা ও অচিরাচরিত শক্তির শক্তিশালী পরিকাঠামো তাকে রক্ষা করবে। যদিও ভারতে প্রায় ০.০৩ শতাংশ বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে, তবুও এলএনজি নির্ভরতার হার কম হওয়ায় বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ভারতের অর্থনীতিতে খুব একটা বড় আঘাত করতে পারবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে দীর্ঘমেয়াদে হরমুজ প্রণালীর এই অচলাবস্থা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সুরক্ষায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে, যা নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy