সমুদ্রের অতল গভীরে চিনের দাপট! ডাটা সেন্টার তৈরি করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিল বেজিং

প্রযুক্তির জগতে এক নতুন যুগের সূচনা করল চিন। ডাটা সেন্টারের রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা মাথায় রেখে চিন সমুদ্রের তলদেশে তৈরি করেছে একটি আস্ত ডাটা সেন্টার, যা বর্তমানে কাজও শুরু করেছে। চিনা সরকারের দাবি, এই বৈপ্লবিক পদক্ষেপ তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী এবং দ্রুততর করবে। শাংহাই উপকূল থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০ মিটার গভীরে অবস্থিত এই কেন্দ্রটি ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

নতুন এই ডাটা সেন্টারটির একটি অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ক্ষমতা। চিনা সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাধারণ স্থলে অবস্থিত ডাটা সেন্টারের তুলনায় এই সেন্টারে বিদ্যুৎ খরচ পাঁচ ভাগের এক ভাগ। ২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই প্রকল্পটি তৈরি করা হয়েছে ‘হাইক্লাউড টেকনোলজি’ (HiCloud Technology) এবং চিনা সরকারের অধীনস্থ সংস্থা ‘চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন’-এর যৌথ উদ্যোগে। ডাটা সেন্টারের বড় অংশটি পরিচালিত হবে বায়ুশক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের সাহায্যে।

সাধারণ ডাটা সেন্টারে প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হওয়ার অন্যতম কারণ হলো সার্ভার ঠান্ডা রাখা। সাধারণত সার্ভার শীতল করার জন্য জলের প্রয়োজন হয়, যার জন্য পাইপলাইনের মাধ্যমে জল পরিবহনে মোট বিদ্যুতের ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যয় হয়ে যায়। সমুদ্রের গভীরে ডাটা সেন্টার তৈরির ফলে এই বিশাল খরচ বেঁচে যাচ্ছে। সমুদ্রের শীতল জল প্রাকৃতিকভাবেই সার্ভার ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করছে, ফলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হচ্ছে অভূতপূর্ব হারে।

তবে এই উদ্ভাবন কেবল চিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং বিশ্বজুড়ে জল সংকটের প্রেক্ষাপটে এটি একটি বড় বার্তা। ‘ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডাটা সেন্টারের জন্য ক্রমবর্ধমান জলের চাহিদা ২০৩০ সালের মধ্যে ৯.৩ ট্রিলিয়ন লিটারে পৌঁছাতে পারে, যা সাব-সাহারান আফ্রিকার ১৩০ কোটি মানুষের সারা বছরের জলের চাহিদার সমান। এই সংকটের মোকাবিলায় সমুদ্রের নিচে ডাটা সেন্টার স্থাপন এক টেকসই সমাধান হতে পারে।

উল্লেখ্য, সমুদ্রের নিচে ডাটা সেন্টার তৈরির ধারণাটি একেবারেই নতুন নয়। ২০১৮ সালে প্রযুক্তি জায়ান্ট ‘মাইক্রোসফট’ উত্তর স্কটল্যান্ডের উপকূলে সমুদ্রের গভীরে একটি ডাটা সেন্টার পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছিল। প্রায় দুই বছর ধরে সেই প্রকল্পের সফল কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের পর মাইক্রোসফট জানিয়েছিল, সমুদ্রের পরিবেশ সার্ভার পরিচালনার জন্য অত্যন্ত উপযোগী এবং সাশ্রয়ী। মাইক্রোসফটের সেই পরীক্ষামূলক সাফল্যের হাত ধরেই চিন এখন বাণিজ্যিকভাবে এই বিশাল পরিকাঠামো তৈরি করল।

চিনের এই পদক্ষেপ কেবল প্রযুক্তিগত উৎকর্ষই নয়, বরং পরিবেশের ওপর চাপের ভারসাম্য বজায় রাখার একটি বড় বার্তা। ডাটা সেন্টারগুলোর ক্রমবর্ধমান বিদ্যুত ও জল ব্যবহারের চাহিদা আগামী দিনে যে সংকটের জন্ম দিতে পারে, সমুদ্রের তলদেশের এই প্রযুক্তি হয়তো সেই পথ থেকে পৃথিবীকে কিছুটা মুক্তি দিতে পারবে। এখন দেখার বিষয়, চিন এই মডেলকে কতটা বড় আকারে এবং কত দ্রুত সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পারে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy