জাতীয় স্তরের প্রবেশিকা ও নিয়োগ পরীক্ষাগুলিতে (যেমন NEET, CUET) প্রশ্নফাঁস, প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার পরিপ্রেক্ষিতে কংগ্রেস সাংসদ দিগ্বিজয় সিংয়ের নেতৃত্বাধীন সংসদীয় স্থায়ী কমিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট পেশ করেছে। এই রিপোর্টে পরীক্ষা পরিচালনা সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (NTA) এবং অ্যাক্রিডিটেশন সংস্থা NAAC-এর কার্যকারিতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এবং বেশ কিছু মৌলিক সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে।
১. মূল উদ্বেগ: সিলেবাস বিতর্ক ও কোচিংয়ের দাপট
কমিটির সবচেয়ে বড় উদ্বেগটি হলো জাতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষার সিলেবাস নিয়ে।
স্কুল পাঠ্যক্রম থেকে বিচ্যুতি: কমিটির পর্যবেক্ষণ, NTA পরিচালিত বহু পরীক্ষার প্রশ্নপত্র এখন আর স্কুলের কারিকুলামের (পাঠ্যক্রম) সঙ্গে মিল রেখে তৈরি হয় না।
কোচিং-কেন্দ্রিক বাণিজ্য: কমিটির মতে, এই ধরনের বিচ্যুতি কোচিং-কেন্দ্রিক ব্যবসাকেই শক্তিশালী করছে। এর ফলে যে শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত কোচিং নিতে আর্থিকভাবে সামর্থ্য নয়, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শিক্ষায় বৈষম্য: এই পদ্ধতি শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং সংবিধান স্বীকৃত সমান সুযোগের নীতি ভঙ্গ করছে। কমিটির স্পষ্ট মত, পরীক্ষার প্রশ্ন অবশ্যই স্কুল পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, যাতে অযথা কোচিং নির্ভরতা না বাড়ে।
কোচিং নিয়ন্ত্রণ: লাগামহীন কোচিং সেন্টার নিয়ন্ত্রণে একটি উচ্চস্তরের কমিটি গঠনেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
২. পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন: খাতা-কলমের (Pen-and-Paper) পক্ষে মত
প্রশ্নফাঁসের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্র যেখানে কম্পিউটার-ভিত্তিক পরীক্ষাকে (CBT) গুরুত্ব দিতে চায়, সংসদীয় কমিটি সেখানে উল্টো অবস্থান নিয়েছে।
CBT-তে অদৃশ্য বিপদ: কমিটির বক্তব্য, খাতা-কলমের পরীক্ষায় ঝুঁকির ক্ষেত্রগুলি চোখে দেখা গেলেও, CBT পরীক্ষায় হ্যাকিংয়ের বিপদ গভীর ও অদৃশ্য।
সুপারিশ: NTA-এর উচিত UPSC ও CBSE-এর উদাহরণ মেনে আবার কাগজ-কলম মডেলকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
CBT-এর শর্ত: যদি CBT-তে পরীক্ষা নিতেই হয়, তবে তা যেন কেবলমাত্র সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন পরীক্ষাকেন্দ্রেই অনুষ্ঠিত হয়, বেসরকারি কেন্দ্রে নয়।
৩. NTA-এর ব্যর্থতা ও নিরাপত্তার অগ্রাধিকার
গত বছরের NEET 2024 বিতর্কের পর NTA-এর ওপর ভরসা ফেরানোই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে কমিটি মনে করে।
ব্যর্থতার পরিসংখ্যান: কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, NTA-এর পরিচালিত ১৪টি পরীক্ষার মধ্যে ৫টিতে বড়সড় ত্রুটি দেখা গিয়েছিল এবং তিনটি পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছিল।
নিরাপত্তাই প্রথম: ইসরোর প্রাক্তন প্রধান কে রাধাকৃষ্ণনের নেতৃত্বাধীন কমিটি ধাপে ধাপে CBT-তে যাওয়ার পক্ষে মত দিলেও, সংসদীয় কমিটি তা নাকচ করে দিয়েছে। কমিটির স্পষ্ট বক্তব্য, “প্রথমে পরীক্ষার নিরাপত্তার বলয় মজবুত করতে হবে, তারপর প্রযুক্তিগত পরিবর্তন।” অর্থাৎ নিরাপত্তা ছাড়া প্রযুক্তির আগ্রসর হওয়া চলবে না।
স্বচ্ছতা: পরীক্ষা পরিচালনার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও নজরদারি আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৪. NTA-এর উদ্বৃত্ত তহবিল ব্যবহারে স্বচ্ছতা
গত ছয় বছরে NTA-এর ৪৪৮ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত তহবিল নিয়েও কমিটি প্রশ্ন তুলেছে।
উদ্বৃত্তের ব্যবহার: কমিটির প্রশ্ন, এই বিপুল অর্থ কোথায় এবং কী কাজে ব্যবহার হচ্ছে? তা কি সত্যিই পরীক্ষার অবকাঠামো উন্নতিতে লাগানো হচ্ছে?
সুপারিশ: এই তহবিল স্বচ্ছভাবে পরীক্ষা নিরাপত্তা, নিজস্ব সার্ভার তৈরি এবং প্রযুক্তিগত নজরদারি ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যয় করতে হবে।
৫. CUET ফল প্রকাশে বিলম্ব নিয়ে ক্ষোভ
কমিটি CUET-এর ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত অ্যাকাডেমিক বর্ষ: ফল প্রকাশে বিলম্বের কারণে ভর্তি প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে, অ্যাকাডেমিক সেশনের শুরু পিছোচ্ছে এবং ছাত্রছাত্রীদের মানসিক চাপ বাড়ছে।
বাধ্যতামূলক নির্দেশ: দ্রুত ও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ফলপ্রকাশ বাধ্যতামূলক করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৬. NAAC-এ ঘুষের অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ তদন্ত
NAAC (National Assessment and Accreditation Council)-এর মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় ঘুষের অভিযোগ (গুন্টুরের KLEF-কে A++ গ্রেড দেওয়া) প্রসঙ্গে কমিটি অবিলম্বে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে।
স্বচ্ছতা ও ব্যাখ্যা: যদিও NAAC ইতিমধ্যেই ২০০টি প্রতিষ্ঠানের গ্রেড পুনর্বিবেচনা করেছে এবং ৯০০ পিয়ার অ্যাসেসরকে বাদ দিয়েছে, তবে কমিটির মতে, পুরো প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা জনসমক্ষে রাখা উচিত।
নতুন সিস্টেম: শিক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, ২০২২-এর রাধাকৃষ্ণন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী একটি নতুন অ্যাক্রিডিটেশন সিস্টেম শিগগিরই চালু হতে পারে।
এই রিপোর্ট শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে: “শিক্ষার ভিত্তিকাঠামো কি কোচিংনির্ভর বাণিজ্যের হাতে চলে যাচ্ছে?”