ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত হলো এক নতুন ও বিধ্বংসী পালক। দেশীয় প্রতিরক্ষা সংস্থা ‘নিবে গ্রুপ’ (Nibe Group)-এর তৈরি অত্যাধুনিক ‘বায়ু অস্ত্র-১ লোইটারিং মিউনিশন’ (Vayu Astra-1 Loitering Munition) সফলভাবে তার অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। এটি মূলত একটি শক্তিশালী আত্মঘাতী বা ‘কামিকাজে’ (Kamikaze) ড্রোন, যা রণক্ষেত্রে শত্রুর কাছে এখন এক মূর্তিমান আতঙ্ক। আকাশে ঈগলের মতো দীর্ঘক্ষণ ভেসে থেকে শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এবং সঠিক সময়ে নিখুঁত লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিস্ফোরণ ঘটানোই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য।
সম্প্রতি রাজস্থানের পোখরান ও উত্তরাখণ্ডের জোশীমঠের দুর্গম মালারি এলাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে ‘নন-কস্ট, নো কমিটমেন্ট’ (NCNC) ভিত্তিতে এই ড্রোনের কার্যকারিতা প্রদর্শন করা হয়। পোখরানের মরুভূমিতে ১০ কেজি বিস্ফোরক ওয়ারহেড বহনকারী এই ড্রোনটি ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শত্রুর আস্তানাকে প্রথম প্রচেষ্টাতেই নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। এর লক্ষ্যভেদী ক্ষমতা এতটাই নির্ভুল যে, এর ‘সার্কুলার এরর প্রোব্যাবিলিটি’ (CEP) ছিল ১ মিটারেরও কম। অর্থাৎ, এটি তার উদ্দিষ্ট লক্ষ্য থেকে চুল পরিমাণও বিচ্যুত হয়নি।
এই ড্রোনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘অ্যাটাক অ্যাবোর্ট’ প্রযুক্তি। ড্রোনটি লক্ষ্যবস্তুর ওপর আক্রমণের ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত মিশন বাতিল বা স্থগিত করে নতুন করে হামলার পরিকল্পনা করতে সক্ষম, যা আধুনিক যুদ্ধের ময়দানে অত্যন্ত জরুরি। ইসরায়েলি প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই ড্রোনটি একইসঙ্গে অ্যান্টি-পার্সোনেল এবং অ্যান্টি-আর্মার (ট্যাঙ্ক-বিরোধী) ভূমিকা পালন করতে পারে। পোখরানে রাত্রিকালীন পরীক্ষার সময় একটি ইনফ্রারেড (IR) ক্যামেরা ব্যবহার করে ড্রোনটি অন্ধকারে শত্রু ট্যাঙ্ক শনাক্ত করে এবং মাত্র ২ মিটারের নির্ভুলতায় হামলা চালায়। এছাড়া, ৭০ কিলোমিটার দূর থেকে কন্ট্রোল স্টেশন হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটিও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
মরুভূমির উত্তাপ পেরিয়ে এই ড্রোনটির আসল কঠিন পরীক্ষা ছিল উত্তরাখণ্ডের ১৪,০০০ ফুট উচ্চতার হিমালয় অঞ্চলে। তীব্র হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় পার্বত্য ভূখণ্ডের প্রতিকূল আবহাওয়ায় ড্রোনটি অনবদ্য কার্যকারিতা দেখিয়েছে। রেকর্ড গড়ে এটি একটানা ৯০ মিনিটেরও বেশি আকাশে ভেসে থেকে মিশন সম্পন্ন করে এবং পরে অক্ষত অবস্থায় অবতরণ করে, যা প্রমাণ করে যে এটি পুনরায় ব্যবহারের যোগ্য।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ‘বায়ু অস্ত্র-১’ ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য এক যুগান্তকারী পরিবর্তন হতে চলেছে। চীন ও পাকিস্তান সীমান্ত বরাবর, বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল ও সমতলে শত্রুর বাঙ্কার, যানবাহন এবং সেনাসমাবেশ ধ্বংস করতে এটি অত্যন্ত কার্যকর। দিনের আলো কিংবা গভীর অন্ধকার—সবক্ষেত্রেই সমান দক্ষতায় আঘাত হানতে সক্ষম এই ড্রোন ভারতের সামরিক শক্তিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল।





