পশ্চিম রাজস্থানের তীব্র দাবদাহে যখন জলের প্রতিটি ফোঁটা অমূল্য, যখন মরুভূমির রুক্ষতায় তৃষ্ণার্ত বন্যপ্রাণীরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, তখন এক ব্যক্তি নিজের জীবনকে বাজি রেখে তৈরি করেছেন জীবনের এক নতুন ঠিকানা। তিনি নরপত সিং রাজপুরোহিত, যাঁর নাম আজ রাজস্থানের মরুভূমির ‘গ্রিনম্যান’ হিসেবে পরিচিত। গত ১৫ বছর ধরে তিনি যে অসাধ্য সাধন করেছেন, তা পরিবেশ সংরক্ষণের ইতিহাসে এক অনন্য নজির।
পরিবেশ রক্ষায় তাঁর নিষ্ঠা কত গভীর, তা বোঝা যায় তাঁর ত্যাগের বহর দেখলে। টঙ্ক জেলায় নরপত সিংয়ের একটি অত্যন্ত সফল মিষ্টির দোকান ছিল। কিন্তু মাটির টানে, প্রকৃতির ডাকে তিনি থিতু হতে পারেননি। প্রায় ১৫ বছর আগে ৩০ লক্ষ টাকায় সেই ব্যবসা বিক্রি করে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করেন পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষার কাজে। আজ তিনি কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি মরুভূমির তৃষ্ণার্ত হাজারো প্রাণীর রক্ষাকর্তা।
রাজস্থানের বারমের, জয়সলমের, বিকানের এবং যোধপুর জেলায় তিনি নিজের হাতে ১৪টি জলাধার নির্মাণ করেছেন। প্রচণ্ড গ্রীষ্মে এই জলাধারগুলোই হয়ে ওঠে মরুভূমির পশু-পাখিদের বাঁচিয়ে রাখার শেষ ভরসা। এছাড়া, তিন বছর আগে কোজানিয়োঁ কি ধানি এলাকায় বিশ্বের বৃহত্তম ‘অশ্বত্থ বাটিকা’ তৈরির অভিযান শুরু করেন তিনি। ১,৪০০টি অশ্বত্থ গাছ রোপণ করে আজ সেগুলোকে সগৌরবে বড় করে তুলেছেন। তাঁর লক্ষ্য, এই স্থানটিকে পরিবেশগত ভারসাম্য ও অক্সিজেন উৎপাদনের কেন্দ্রে পরিণত করা।
তবে নরপতের কাজের পরিধি শুধু রাজস্থানে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরিবেশের বার্তা ছড়িয়ে দিতে তিনি বেরিয়ে পড়েছিলেন অসাধ্য সাধনের পথে। ২০১৯ সালের ২৭শে জানুয়ারি জম্মু-কাশ্মীর থেকে শুরু করে ২০২২ সালের ২০শে এপ্রিল পর্যন্ত তিনি সাইকেলে পাড়ি দিয়েছেন ৩০,১২১ কিলোমিটার পথ। ভারতের ২৬টি রাজ্য ও শত শত জেলা স্পর্শ করা এই সাইকেল যাত্রা জায়গা করে নিয়েছে ইন্ডিয়া বুক অফ রেকর্ডস, এশিয়া বুক অফ রেকর্ডস ও গিনেস বুক অফ রেকর্ডসে।
গাছ লাগানো শুধু নয়, বিগত বছরগুলোতে তিনি প্রায় আড়াই লক্ষ গাছ বিতরণ ও রোপণ করেছেন। কেবল গাছ লাগানোই নয়, সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণেও তিনি নিরলস। বন্যপ্রাণী রক্ষায় তাঁর অবদানও এককথায় অনবদ্য। আহত ৪০০-র বেশি হরিণ, ময়ূর, শিয়াল, ঈগলসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণীকে তিনি মৃত্যু মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। চোরাশিকারিদের হাত থেকে বনভূমিকে রক্ষা করতেও তিনি সমান তৎপর।
আরাবল্লী পর্বতমালা সংরক্ষণ থেকে প্লাস্টিক-মুক্ত ভারত গড়া—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছেন। স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে তিনি হাজার হাজার মানুষকে প্রকৃতি সংরক্ষণের মন্ত্রে দীক্ষিত করছেন। নরপত সিং রাজপুরোহিত আজ প্রমাণ করেছেন, পরিবেশ রক্ষা শুধু সরকারি দায়িত্ব নয়, এটি একটি ব্যক্তিগত অঙ্গীকার। মরুভূমির উত্তপ্ত বালুকায় দাঁড়িয়ে তিনি আজ এক সবুজ বিপ্লবের স্বপ্ন দেখছেন, যা আমাদের প্রত্যেকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।





