২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল জমানার অবসান ঘটিয়ে নবান্নের দখল নিতে চলেছে বিজেপি। কিন্তু এই অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বদল কেবল পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের রাজনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, এর সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর। দুই বাংলার রাজনৈতিক মহলেই এখন একটাই প্রশ্ন— দিদি পরবর্তী বাংলায় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কোন পথে হাঁটবে?
তিস্তা চুক্তির জট কি এবার খুলবে?
এতদিন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম কাঁটা ছিল তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি। দিল্লির মোদী সরকার এই চুক্তি করতে আগ্রহী হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে তা বারবার আটকে গিয়েছে। এখন কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দলের (বিজেপি) সরকার থাকায় সেই বাধা দূর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ঢাকার বিদেশ মন্ত্রক ইতিমধ্যেই ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে’ তিস্তা চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা ফ্যাক্টর না থাকায় তিস্তা প্রকল্প নিয়ে দিল্লির হাত এখন অনেকটাই শক্ত।
অনুপ্রবেশ ও ‘পুশ-ইন’ আতঙ্ক
নির্বাচনী প্রচারের শুরু থেকেই বিজেপি নেতা সুভেন্দু অধিকারী এবং হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুতে সুর চড়িয়েছেন। বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় আসায় সীমান্ত নিরাপত্তা আরও কঠোর হতে চলেছে। বিজেপির ইশতেহারে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ক্ষমতায় আসার ৪৫ দিনের মধ্যে সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু হবে। এর ফলে সীমান্ত বাণিজ্য এবং চোরাচালান বন্ধের পাশাপাশি ‘পুশ-ইন’ বা অবৈধ বাসিন্দাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আশঙ্কায় ঢাকার অন্দরে উদ্বেগ বাড়ছে।
বাণিজ্য ও কানেক্টিভিটিতে নতুন মোড়
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। বিজেপি সরকার বাংলায় শিল্পায়ন এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ট্রানজিট এবং কানেক্টিভিটি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে দিল্লির। যদি পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যিক পরিবেশ উন্নত হয়, তবে তা দুই দেশের অর্থনীতির জন্যই ইতিবাচক হতে পারে। বিশেষ করে হলদিয়া পোর্ট এবং রেল কানেক্টিভিটি নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
চাণক্যের আগমন ও ভবিষ্যৎ
আজই কলকাতায় পা রাখছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। আগামিকাল ব্রিগেডে নতুন সরকারের শপথ। শাহর এই সফর কেবল মুখ্যমন্ত্রী বাছাইয়ের জন্য নয়, বরং পূর্ব সীমান্তে ভারতের বিদেশনীতি ঠিক করার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভারতে ক্ষমতার এই বদল— সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক ‘মেগা রিসেট’ বা বড়সড় পরিবর্তনের ঘণ্টা বেজে গেল।
বাংলার মসনদে বিজেপির বসা বাংলাদেশের জন্য ‘আশীর্বাদ’ হবে না কি ‘চ্যালেঞ্জ’, তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত দুই বাংলার নজর এখন কলকাতার রাজভবন আর নবান্নের দিকে।





