লোকসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। ঠিক তার আগেই বাংলার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলল ভারতীয় জনতা পার্টি। রাজ্যে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে ফের একবার বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিল গেরুয়া শিবির। বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ তথা প্রধান মুখপাত্র শমীক ভট্টাচার্য সরাসরি ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি লিখে বাংলায় আসার আর্জি জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, রাজ্যের ভোটার তালিকায় যে ভয়াবহ কারচুপি এবং জালিয়াতি হয়েছে, তা দিল্লির ফুল বেঞ্চের সদস্যরা এখানে এসে সরেজমিনে তদন্ত না করলে ধরা সম্ভব নয়।
বিজেপির পক্ষ থেকে দীর্ঘ দিন ধরেই অভিযোগ করা হচ্ছে যে, পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ভোটার তালিকায় কারচুপি করছে। কিন্তু এবারের অভিযোগের মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গিয়েছে বলে মত রাজনৈতিক মহলের। শমীক ভট্টাচার্যের লেখা চিঠিতে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং চাঞ্চল্যকর কিছু অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে। শমীকবাবু সাফ জানিয়েছেন, “আমরা তথ্যপ্রমাণ সহ দেখেছি, হাজার হাজার মৃত মানুষের নাম এখনও ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। দিনের পর দিন এই মৃত ব্যক্তিদের নামে ‘ভুয়ো’ ভোট পড়ে আসছে। এবারও সেই একই ছক কষা হয়েছে।”
আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হল, বিজেপির দাবি অনুযায়ী, লক্ষ লক্ষ বৈধ ভারতীয় নাগরিকের নাম, বিশেষ করে যাঁরা বিজেপি সমর্থক বলে পরিচিত, তাঁদের নাম রহস্যজনকভাবে তালিকা থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে ভোটার সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, “এটি অত্যন্ত গভীর চক্রান্ত। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট করে নির্বাচনী ফায়দা তোলার চেষ্টা চলছে। এটা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।”
শমীক ভট্টাচার্য তাঁর চিঠিতে CEC জ্ঞানেশ কুমারকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় অনুরোধ করেছেন, “দয়া করে আপনি পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ নিয়ে অবিলম্বে পশ্চিমবঙ্গে আসুন। আমরা আপনাকে হাতে-কলমে দেখিয়ে দেব কীভাবে জালিয়াতি হয়েছে। লোকাল অফিসারদের উপর ভরসা করলে আসল সত্য অধরাই থেকে যাবে। কারণ, রাজ্যের পুলিশ এবং প্রশাসনের একাংশ সম্পূর্ণভাবে শাসক দলের ক্যাডারে পরিণত হয়েছে।”
বিজেপির এই পদক্ষেপ রাজ্যে নির্বাচনী আবহাওয়াকে চরম তপ্ত করে তুলেছে। শমীক ভট্টাচার্যের এই নালিশের পর দিল্লির নির্বাচন কমিশন কী পদক্ষেপ নেয়, তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। বিজেপি পরিষ্কার করে দিয়েছে, এই ‘দূষিত’ ভোটার তালিকা দিয়ে বাংলায় কোনোভাবেই অবাধ নির্বাচন সম্ভব নয়। তারা কেন্দ্রীয় বাহিনীকে দিয়ে বুথ পাহারা দেওয়ার পাশাপাশি ভোটার তালিকা ‘শুদ্ধিকরণ’-কেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লোকসভা ভোটের আগে ভোটার তালিকা নিয়ে এই সংঘাত আগামী দিনে আরও বড় আইনি এবং রাজনৈতিক লড়াইয়ের রূপ নিতে পারে। তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য এই সব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ এবং ‘পরাজয়ের আগাম অজুহাত’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু বিজেপির এই সাঁড়াশি আক্রমণ রাজ্য নির্বাচন কমিশনের উপর যে প্রবল চাপ সৃষ্টি করল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।