রাজনৈতিক পালাবদলের রেশ কাটতে না কাটতেই এখন টলিপাড়ার অলিতে-গলিতে একটাই আলোচনা—‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর দাপট আর টলিউডের দৈন্যদশা। দীর্ঘ ১৫ বছর ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের ‘একনায়কতন্ত্রে’ পিষ্ট ছিল বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। অভিযোগ, অরূপ বিশ্বাসের ভাইয়ের ইশারা ছাড়া স্টুডিও পাড়ায় পাতা নড়ত না। কাটমানি, অভিনেতা-টেকনিশিয়ানদের ইচ্ছেমতো ব্যান করা, আর গিল্ড কার্ডের নামে তোলাবাজি—সব মিলিয়ে টলিপাড়ার ওয়ার্ক কালচার তলানিতে ঠেকেছিল।
বর্তমান সরকারের পরিবর্তনের পর টলিপাড়ায় এক নতুন হাওয়া বইছে। রুদ্রনীল ঘোষ ও পাপিয়া অধিকারীরা বলছেন, “ভয় আউট, ভরসা ইন”। টেকনিশিয়ান্স স্টুডিওর দখল থেকে স্বরূপ বিশ্বাসের সরে আসা এবং ফেডারেশনের অচলাবস্থা নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, নেহাতই মুখ বদল নাকি সত্যিই ইন্ডাস্ট্রি ফিরবে তার স্বর্ণযুগে? পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় থেকে দেব—প্রত্যেকেই মুখ খুলেছেন ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান সঙ্কট নিয়ে। কাজ কমে যাওয়া, সিরিয়াল বন্ধ হওয়া এবং ব্যান কালচারের বিষবাস্পে আজ টলিউড ধুঁকছে। বিশেষ করে প্রযোজকদের ওপর অযৌক্তিক বাজেটের বোঝা চাপিয়ে যেভাবে ইন্ডাস্ট্রিকে অচল করা হয়েছিল, তা থেকে মুক্তি চান শিল্পী ও কলাকুশলীরা।
ইম্পার (EIMPA) অন্দরমহলে পিয়া সেনগুপ্ত বনাম রতন সাহার লড়াইও এখন চরম আকার ধারণ করেছে। আইনত সভাপতি পিয়া হলেও, কার্যত কুর্সিতে রতন সাহা। এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রশাসনিক জটিলতা সিনেমা রিলিজের ক্ষেত্রেও তৈরি করেছে অনিশ্চয়তা। অথচ, সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক-ঋতুপর্ণের হাতে গড়া এই ইন্ডাস্ট্রি আজ ওটিটি ও স্যাটেলাইট রাইটসের বাজারে মার খাচ্ছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর কড়াকড়ি এবং সিঙ্গল-স্ক্রিন হলগুলোর বিলুপ্তি বাংলা সিনেমার বাজারকে সংকুচিত করে ফেলেছে।
তবে কি শুধু দুর্নীতিই দায়ী? না, অর্থনৈতিক চাপ ও দর্শক টানার লড়াইয়েও বাংলা ছবি এখন দিশেহারা। একদিকে দর্শক টানার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে একই দিনে একাধিক বড় ছবির রিলিজ নিয়ে প্রযোজকদের অন্তর্দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে টলিউড আজ এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে। স্ক্রিনিং কমিটির বিতর্কিত বিদায় নতুন জটিলতার সৃষ্টি করেছে। এই সঙ্কটের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ইন্ডাস্ট্রির প্রতিটি স্তরের মানুষ চাইছেন এমন এক সুস্থ পরিবেশ, যেখানে মেধা ও সৃজনশীলতা প্রাধান্য পাবে, রাজনৈতিক দাদাগিরি নয়। ইতিহাস বলছে, সঙ্কট থেকেই সৃজনশীলতার নতুন জন্ম হয়। টলিপাড়া কি পারবে সেই ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস লিখতে? উত্তর দেবে সময়।





