কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের বেতন কাঠামো নির্ধারণে এবার এক নতুন ও বৈজ্ঞানিক মোড় নিয়েছে অষ্টম বেতন কমিশনের আলোচনা। দীর্ঘদিনের পুরনো ‘ক্যালোরি তত্ত্ব’-কে খারিজ করে কর্মচারী সংগঠনগুলি দাবি তুলেছে ‘৩৪৯০ ক্যালোরি’র নতুন ফর্মুলা। তাদের মতে, মুদ্রাস্ফীতির দোহাই দিয়ে নয়, বরং আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান ও বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী একজন শ্রমজীবী মানুষের ন্যূনতম মজুরি পুনঃনির্ধারণ করা জরুরি।
কেন এই ৩৪৯০ ক্যালোরির বিতর্ক?
এতদিন বেতন কমিশন যে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করত, তা ছিল মূলত ডঃ ওয়ালেস আইক্রয়েডের সেকেলে ২,৭০০ ক্যালোরির ধারণার ওপর ভিত্তি করে। ন্যাশনাল কাউন্সিল-জয়েন্ট কনসালটেটিভ মেশিনারি (এনসি-জেসিএম)-র মতে, বর্তমান সময়ের কর্মব্যস্ততা, মানসিক চাপ এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টা বিবেচনায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের দৈনিক ৩,৪৯০ ক্যালোরির পুষ্টি প্রয়োজন। আইসিএমআর (ICMR) এবং এনআইএন (NIN)-এর সাম্প্রতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, ভারী শারীরিক পরিশ্রমকারী সরকারি কর্মচারীদের এই পরিমাণ পুষ্টির প্রয়োজন। সুতরাং, ক্যালোরির চাহিদা বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই তার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণের খরচও বাড়বে—যা বেতন বৃদ্ধির দাবির মূল ভিত্তি।
দাবি ও পরিসংখ্যানের চুলচেরা বিশ্লেষণ:
কর্মচারী সংগঠনগুলি কেবল দাবির তালিকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং প্রতিটি শহরের চাল, ডাল, তেল, সবজি, দুধ এবং জ্বালানির বর্তমান দামের বিস্তারিত হিসেবও কমিশনের সামনে পেশ করেছে। আবাসন, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার আকাশছোঁয়া খরচ যোগ করে তারা দাবি করেছে যে, বর্তমান বেতন কাঠামো দিয়ে একটি পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ অসম্ভব। তাদের প্রস্তাবিত দাবির নির্যাস হলো:
ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর: ৩.৮৩৩-এ উন্নীত করা।
ন্যূনতম মজুরি: ৬৯,০০০ টাকা নির্ধারণ।
অন্যদিকে, অল ইন্ডিয়া এনপিএস এমপ্লয়িজ ফেডারেশন (এআইএনপিএসইএফ) একটি বিকল্প সূত্র উপস্থাপন করেছে। তাদের মতে, পরিবারের পাঁচ সদস্যের কথা মাথায় রেখে প্রতি ইউনিট ৬,০০০ টাকা হিসেবে মূল বেতন ৩০,০০০ টাকা এবং তার ওপর ৫৮ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা যোগ করলে ন্যূনতম মজুরি ৫৫,০০০ থেকে ৬০,০০০ টাকার মধ্যে হওয়া উচিত।
এর প্রভাব কোথায় পড়বে?
বেতন নির্ধারণের এই নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়িত হলে তা শুধুমাত্র মূল বেতনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মহার্ঘ ভাতা (DA), হাউস রেন্ট অ্যালাউন্স (HRA), পেনশন এবং অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধার ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
বর্তমানে দিল্লি, হায়দ্রাবাদ, শ্রীনগর এবং লাদাখের মতো বিভিন্ন শহরে পর্যায়ক্রমে বৈঠক চালাচ্ছে অষ্টম বেতন কমিশন। বেতন বিতর্ক এখন কেবল ‘স্কেল’-এর গণ্ডিতে আটকে নেই; এটি রূপ নিয়েছে ‘আধুনিক ভারতে একটি সংসার চালানোর প্রকৃত খরচের’ লড়াইয়ে। এখন দেখার বিষয়, সরকার ক্যালোরির এই বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে কতটা সায় দেয় এবং শেষ পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ কর্মচারীর ভাগ্যে কী জুটবে।





