দুবাইয়ে প্রাক্তন আইজিপি বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারির পর থেকেই জল্পনা তুঙ্গে—তিনি কি সত্যিই দেশে ফিরছেন? ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে দুবাই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করলেও, আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ফেরানোর আসল লড়াইটা কেবল শুরু হলো। পুলিশের এনসিবি (ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো) সূত্রে খবর, এটি কোনো সাধারণ প্রক্রিয়া নয়। গ্রেপ্তারের পর প্রত্যর্পণের বিষয়টি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং মামলার নথিপত্রের গ্রহণযোগ্যতার ওপর।
বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। ইন্টারপোলের তালিকায় বর্তমানে ৫৯ জন বাংলাদেশি পলাতক রয়েছেন, যাদের বড় অংশকে বছরের পর বছর ধরে দেশে আনা সম্ভব হয়নি। এর আগে আরাভ খান কিংবা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। ভিন্ন দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার কিংবা নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতায় অনেক সময় সফল হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে বেনজীর আহমেদের ক্ষেত্রে আশার আলো দেখছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তাঁর মতে, যেহেতু ইন্টারপোলের রেড নোটিশ দুদকের আবেদনের ভিত্তিতেই হয়েছিল এবং দুবাই পুলিশ তাকে সেই ভিত্তিতেই ধরেছে, তাই আরব আমিরাতের সদিচ্ছা থাকলে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হবে না।
ইতিমধ্যে বেনজীরকে ফিরিয়ে আনতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে পুলিশ ও দুদক। পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, দুদকের মামলার নথিপত্র গোছানোর কাজ চলছে। স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে দ্রুত এই নথি পাঠাতে হবে। ৩০ দিনের সময়সীমার মধ্যেই আইনি প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও কোমর বেঁধে নেমেছে। গুম, খুন ও গণহত্যার অন্তত ১০টি মামলায় বেনজীরের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্যপ্রমাণ ট্রাইব্যুনালের হাতে রয়েছে। যার মধ্যে শাপলা চত্বরের ঘটনা ও চট্টগ্রামের একরাম কমিশনার হত্যাকাণ্ড অন্যতম।
প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌসের মতে, এক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাক না থাক, কূটনৈতিক চ্যানেলের সদ্ব্যবহারই মূল চাবিকাঠি। যদি পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দুবাইকে আশ্বস্ত করা যায়, তবে তাকে ফেরাতে বাধা থাকার কথা নয়। তবে তিনি অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন কি না, তা নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা থাকলেও, বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবেই তাকে আটক করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ১৪ কোটি ৬২ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলা ছাড়াও পাঁচটি মামলার তদন্ত চলমান। এছাড়াও সরকারি চাকরিতে থাকাকালীন জাল পাসপোর্ট তৈরি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। র্যাবের প্রধান থাকার সময় একাধিক গুমের ঘটনার সঙ্গে নাম জড়িয়েছে তার। সব মিলিয়ে বেনজীর আহমেদের ঘরে ফেরা এখন কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষাও বটে।





