কুশমণ্ডি, দক্ষিণ দিনাজপুর: সারা রাজ্য যখন দীপান্বিতা অমাবস্যায় কালী আরাধনায় মেতে উঠেছে, তখন পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুশমণ্ডির আমিনপুর গ্রামের এক প্রাচীন প্রথা আজও ইতিহাস ধরে রেখেছে। এই গ্রামে ৬০০ বছর ধরে মা কালীর এক বিশেষ রূপ, ‘মা মাটিয়া কালী’-র পূজা হয়ে আসছে। কিন্তু প্রথা অনুসারে, আজও দেবীর জন্য কোনো স্থায়ী বা পাকা মন্দির তৈরি করা হয়নি—পূজা হয় কেবল মাটির বেদীতে।
কার্তিক মাসের এই অমাবস্যা রাতে এই পূজা শুরু হয়েছিল অবিভক্ত বাংলায়, প্রায় ৬০০ বছর আগে। ব্রিটিশ আমলে জমিদার রাঘবেন্দ্র রায়চৌধুরী এই পূজার প্রধান পৃষ্ঠপোষক হন। জনশ্রুতি আছে, জমিদার স্বপ্নে দৈব নির্দেশ পেয়েছিলেন, তাই আজও দেবীর জন্য কোনো পাকা মন্দির তৈরি হয়নি।
মাটিতেই দেবীর বিশ্রাম, তাই মাটিতেই ঘুমায় জমিদার পরিবার
এই পূজার সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, মা কালীর প্রতিমা একটি মাটির বেদীর ওপরে স্থাপন করা হয় এবং পূজা শেষ হওয়ার পর তা ধীরে ধীরে মাটিতে মিশে যায়। গ্রামের বাসিন্দা সুনীলচন্দ্র দাস জানান, তিনি ৭৪ বছর ধরে এই পূজা দেখে আসছেন।
গ্রামের একজন বাসিন্দা, সুশান্ত বর্মণ জানান, “আমাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকে মাটিয়া কালী পূজা চলে আসছে। দক্ষিণ দিনাজপুর, রায়গঞ্জ এবং মালদহ সহ দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে মায়ের আশীর্বাদ নিতে আসেন।”
যেহেতু দেবী মাটির ওপরে বিরাজ করেন, তাই পূজার দিনগুলিতে জমিদার পরিবারের সদস্যরাও মেঝেতে বা মাটিতেই ঘুমিয়ে থাকেন।
‘রটন্তী কালী’ থেকে ‘মাটিয়া কালী’: ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জয়
কথিত আছে, এই দেবী একসময় ‘রটন্তী কালী’ নামে পরিচিত ছিলেন। এই দেবীর আশীর্বাদেই জমিদার পরিবার ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সফলভাবে লড়াই করেছিল। পরে মাটির বেদীর ওপর পূজা হওয়ার কারণে তিনি ‘মা মাটিয়া কালী’ নামে পরিচিত হন। এলাকার মানুষ যেকোনো নতুন কাজ শুরুর আগে মায়ের পূজা দেন।
পশু বলির প্রথা আজও প্রচলিত
আমিনপুরে মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা আসেন। পূজার সঙ্গে এখানে একটি মেলাও বসে এবং পূজার নির্দিষ্ট স্থানটির পাশেই একটি পঞ্চমুখী শিব মন্দির রয়েছে। জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর বর্তমানে জমিদার পরিবারের বংশধর এবং গ্রামের মানুষ একসঙ্গে এই পূজার আয়োজন করেন।
এই পূজায় আজও পশু বলির প্রথা প্রচলিত রয়েছে। পুরোহিত বিশ্বনাথ সিংহা বলেন, “মা মাটিয়া কালীর পূজা জমিদার বংশের তৈরি করা নিয়ম মেনেই হয়। মায়ের সমস্ত ভোগ এবং নৈবেদ্যর খরচ তাঁরাই বহন করেন। এলাকার কারও কাছে আমরা সাহায্য চাই না। পূজার সময় বিপুল সংখ্যক পশু বলিও দেওয়া হয়।”
দক্ষিণ দিনাজপুরের এই ঐতিহাসিক কালী পূজা সম্পর্কে আপনার কেমন লাগল? এমন কোনো বিশেষ প্রথা কি আপনার এলাকায় রয়েছে?