দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর পূর্ব বিধানসভা এলাকায় ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (SIR) কাজ করানোর ক্ষেত্রে গুরুতর নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। প্রথমে তৃণমূল কংগ্রেসের এক পঞ্চায়েত সদস্যকে বিএলও (BLO – বুথ লেভেল অফিসার) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় সামনে আসার পর তাঁকে সরানো হলেও, নতুন বিএলও-এর বদলে তাঁর এক আত্মীয় এই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন বলে অভিযোগ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর।
বিতর্কের সূত্রপাত: তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্যকে বিএলও নিয়োগ
-
ঘটনা: বারুইপুর পূর্ব বিধানসভার হাড়দহ গ্রাম পঞ্চায়েতের ৯৪ নম্বর বুথে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী সোমা সেনকে বিএলও হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সোমা সেন পার্শ্ববর্তী রামনগর-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচিত সদস্য।
-
সোমা সেনের দাবি: সোমা সেন জানান, তিনি নিজে বিডিও অফিসে গিয়েছিলেন এবং রামনগর থেকে এসে হাড়দহতে কাজ করা তাঁর পক্ষে অসুবিধাজনক এবং তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ও জানিয়েছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাঁর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে বলে।
-
কমিশনের পদক্ষেপ: সোমা সেনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে অভিযোগ জমা পড়লে নির্বাচন কমিশন তাঁকে বিএলও-এর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় এবং শো-কজ করে।
বিএলও একজন, কাজ করছেন অন্যজন: নতুন বিতর্ক
সোমা সেনকে সরানোর পর দেবী হালদারকে বিএলও-এর দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু দেবী হালদার শারীরিকভাবে অসুস্থতার কারণে কাজ করতে পারেননি। অভিযোগ উঠেছে, তাঁর বদলে তাঁর জা (দেবর/ভাসুরের স্ত্রী) রমা হালদার ৯৪ নম্বর বুথে এসআইআর-এর কাজ সামলেছেন। উল্লেখ্য, রমা হালদার নিজেই ৯৬ নম্বর বুথের বিএলও হিসেবে নিযুক্ত।
-
রমা হালদারের বক্তব্য: রমা হালদার দাবি করেন, তিনি দেবী হালদারের জা হিসেবে তাঁকে সাহায্য করেছেন। তাঁর বক্তব্য, দেবী হালদার অসুস্থ এবং এই কাজ বোঝেন না বলেই তাঁকে দিয়ে কাজ করানো হবে, সেই কথা আগেই বলা হয়েছিল।
-
দেবী হালদারের স্বীকারোক্তি: দেবী হালদার নিজেও স্বীকার করেন, “আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু আমি কাজ করিনি। আমি অসুস্থ। রমা আমার জা হন।”
কমিশনের কড়া পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক তরজা
এই ঘটনায় মোট পাঁচজনকে শোকজ করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে সোমা সেন, দেবী হালদার ও রমা হালদার – এই তিন বিএলও সহ ইআরও (ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার) এবং এইআরও (অ্যাসিস্ট্যান্ট ইলেক্ট্রোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার)-কেও কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের জবাব দিতে হবে।
-
বিজেপির তোপ: বিজেপির যাদবপুর সাংগঠনিক জেলার সহ-সভাপতি দিলীপ হালদার অভিযোগ করেছেন, “ওই বুথে বিজেপির বিএলএ-রা (বুথ লেভেল এজেন্ট) কাজ করতে পারেননি। তাহলে আমলারা কি এসআইআর প্রক্রিয়া ভন্ডুল করতেই এই তৃণমূল ক্যাডারদের নিয়োগ করেছিলেন জেনেশুনেই?”
-
সিপিআইএম-এর আক্রমণ: সিপিআইএম নেতা লাহেক আলি বিজেপি ও তৃণমূল উভয়কেই আক্রমণ করে বলেছেন, “বিজেপি চাইছিল প্রকৃত ভোটার বাদ দিয়ে গোলযোগ তৈরি করতে, আর তৃণমূল চাইছিল মৃত ও ভুয়ো ভোটারের নাম রেখে দিতে। সেই উদ্দেশ্যে এসআইআর-কে কাজে লাগানো হয়েছে।”
-
তৃণমূলের পাল্টা: বারুইপুর ব্লক তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী সব দায় নির্বাচন কমিশনের ঘাড়ে ঠেলেছেন। তাঁর দাবি, সোমা সেন বারবার আপত্তি জানালেও তৎকালীন বিডিও তা মানেননি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এসআইআর-এর মূল উদ্দেশ্য ভুয়ো ভোটার বাদ দেওয়া নয়, বরং “প্রকৃত ভোটার বাদ দেওয়া।”
বারুইপুরের বিডিও পন্না দে এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি।