পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল জয়ের পর এখন পদ্ম শিবিরের অন্দরে সাজ সাজ রব। কিন্তু জয়ের আনন্দ ছাপিয়ে এই মুহূর্তে রাজ্য রাজনীতির অলিন্দে সবথেকে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—কে বসছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে? যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও নাম ঘোষণা করা হয়নি, তবে সূত্রের খবর এবং রাজনৈতিক সমীকরণ বিচার করলে একটি নামই এখন সবার মুখে মুখে ঘুরছে, আর তিনি হলেন শুভেন্দু অধিকারী।
বঙ্গ বিজেপির অন্দরের সমীকরণ বলছে, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সরাসরি লড়াইয়ের ময়দানে নিজেকে বারবার প্রমাণ করা শুভেন্দুর পাল্লা বর্তমানে অন্যদের তুলনায় অনেকটাই ভারী। মুখ্যমন্ত্রী পদের দৌড়ে অবশ্য আরও বেশ কিছু নাম নিয়ে জল্পনা চলছে। এই তালিকায় রয়েছেন স্বপন দাশগুপ্ত, অগ্নিমিত্রা পাল, এক প্রভাবশালী সন্ন্যাসী মুখ এবং বর্তমান রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এঁদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
স্বপন দাশগুপ্ত জাতীয় স্তরে অত্যন্ত পরিচিত এবং বিদ্বান ব্যক্তিত্ব হলেও বাংলার মাটিতে তাঁর প্রত্যক্ষ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে। অন্যদিকে, অগ্নিমিত্রা পাল জনপ্রিয় মুখ হওয়া সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানোর ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে দলের একাংশের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। আরএসএস শিবিরের একাংশ একজন সন্ন্যাসী মুখকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে আগ্রহী হলেও, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চূড়ান্ত সম্মতি মিলবে কি না, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। শমীক ভট্টাচার্যের সাংগঠনিক দক্ষতায় দিল্লি অত্যন্ত সন্তুষ্ট, তবে ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে তাঁকে রাজ্য সভাপতির পদেই রেখে দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
এই সমস্ত জটিল অংকের মাঝেই জননেতা হিসেবে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। ২০২১ সালের নন্দীগ্রাম নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি পরাজিত করে তিনি যে চমক দিয়েছিলেন, এবারের নির্বাচনে তা আরও কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। নিজের গড় নন্দীগ্রামে ১০ হাজার ভোটে জয়ের পাশাপাশি কলকাতার খাসতালুক ভবানীপুরে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত করে তিনি কার্যত দিল্লির নেতৃত্বের চোখে অপরাজেয় হয়ে উঠেছেন।
তৃণমূল জমানায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর সামলানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা শুভেন্দুর প্রশাসনিক দক্ষতাকে শাণিত করেছে। মেদিনীপুর থেকে জঙ্গলমহল—দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় তাঁর যে ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ও সংগঠন রয়েছে, তাকেই হাতিয়ার করতে চাইছে বিজেপি। এছাড়া ভবানীপুরে তাঁর মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছিল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। তবে বিজেপির রাজনীতিতে শেষ মুহূর্তের চমক আসা অস্বাভাবিক নয়। অমিত শাহ এবং সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন সমস্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক বিচার করেই চূড়ান্ত সিলমোহর দেবেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম ঘোষণা হওয়া এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।





