কলকাতা: কয়েক মাসের লাগাতার বিক্রির পর অবশেষে ভারতীয় ইক্যুইটি মার্কেটে ফিরতে শুরু করেছে বিদেশী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা (FIIs)। এক বিশাল ‘সেল-অফ’-এর (sell-off) ধাক্কা সামলে ভারতের শেয়ার বাজারে বিদেশিদের এই পুঁজি ঢোকা, দেশীয় বাজারের জন্য এক বড় ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জাতীয় সিকিউরিটিজ ডিপোজিটরি লিমিটেড (NSDL)-এর তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবর মাসের ৭ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত—এই সাতটি ট্রেডিং সেশনের মধ্যে পাঁচটিতেই FIIs ছিল নিট ক্রেতা (net buyers)। এই সময়ের মধ্যে তারা ভারতীয় সেকেন্ডারি মার্কেটে ৩,০০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করেছে।
📉 সেল-অফ-এর পর্ব শেষ, নতুন গতিতে বাজার
এই নতুন প্রবণতা আগের মাসগুলোর তীব্র বিক্রির ঠিক উল্টো। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত FIIs ভারতীয় সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে ২ লাখ কোটি টাকার বেশি তুলে নিয়েছিল। বিশেষত, জুলাই, আগস্ট এবং সেপ্টেম্বরে বিপুল অঙ্কের টাকা তুলে নেওয়ার ফলে ভারতীয় ইক্যুইটি বাজার এক ধাক্কা খেয়েছিল।
তবে, অক্টোবর মাসে পরিস্থিতি বদলেছে। সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে নিট বিক্রি কমে এসেছে মাত্র ₹১,৮৯৩ কোটিতে। দৈনিক ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৭ অক্টোবর ₹১,৪৪১ কোটি এবং ৯ অক্টোবর ₹১,৩০৮ কোটির উল্লেখযোগ্য ক্রয় হয়েছে, যা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ভারতীয় মূল্যায়নের প্রতি ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রতিফলন।
💰 দেশি-বিদেশি দুই শক্তির হাত: বাজারের বড় লাভ
FII-এর এই বিনিয়োগ দেশীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের (DIIs) সঙ্গে মিলে বাজারে বুলিশ গতি এনেছে।
১৫ অক্টোবর, FIIs ₹৬৮.৬৪ কোটি বিনিয়োগ করে, যেখানে DIIs প্রায় ₹৪,৬৫০ কোটি যোগ করে।
এই সম্মিলিত পুঁজির প্রভাবে, অক্টোবর মাসের শুরু থেকে সেন্সেক্স ও নিফটি উভয়ই প্রায় ৩% বেড়েছে।
BSE MidCap এবং SmallCap সূচকও যথাক্রমে ৩.৪% এবং ১.৭% বৃদ্ধি পেয়েছে।
💡 কেন ভারতের দিকে ঝুঁকছে বিদেশিরা? ৪ প্রধান কারণ
ভারতীয় অর্থনীতি এবং বিশ্বব্যাপী একাধিক ঘটনা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মনোভাবে পরিবর্তন এনেছে। এই পালাবদলের নেপথ্যে চারটি মূল কারণ রয়েছে:
১. ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আশাবাদ
১৬ অক্টোবর, ভারতীয় বাণিজ্য কর্মকর্তারা আমেরিকায় আলোচনা করছেন। আমেরিকা ও চিনের মধ্যে বাড়তে থাকা বাণিজ্য সংঘাতের কারণে ভারতের সঙ্গে একটি অনুকূল চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়ছে। এই চুক্তি হলে ভারতীয় রপ্তানি ও কর্পোরেট উপার্জন বাড়তে পারে, যা FIIs-এর জন্য শেয়ার বাজারকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে।
২. শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) সম্প্রতি ভারতের FY26 আর্থিক বছরের বৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬.৬%-এ উন্নীত করেছে। সেপ্টেম্বরে খুচরা মুদ্রাস্ফীতি (CPI) কমে ১.৫৪%-এ নামায় সুদের হার কমার জল্পনা বেড়েছে। এটি ব্যাংক ও অটোমোবাইল-এর মতো ক্ষেত্রগুলোর জন্য ইতিবাচক সংকেত।
৩. স্থিতিশীল রুপি এবং ডলারের দুর্বলতা
বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তার মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ের সম্পদ, যেমন সোনা ও রুপার দাম বাড়ছে। অন্যদিকে, নভেম্বরে আমেরিকান ফেডের সুদের হার কমার প্রত্যাশায় মার্কিন ডলার দুর্বল হচ্ছে। রুপি ১৫ অক্টোবর ১% শক্তিশালী হয়েছে, যা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ভারতীয় ইক্যুইটির প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে।
৪. কর্পোরেট আয়ের পুনরুদ্ধার
জিএসটি (GST) হার হ্রাস এবং জুন মাসে রেপো রেট কমানোর মতো সরকারি পদক্ষেপ, এবং S&P-এর সার্বভৌম রেটিং আপগ্রেড ভারতীয় অর্থনীতির প্রতি আস্থা জুগিয়েছে। কর্পোরেট সংস্থাগুলোর আয়ে উন্নতির লক্ষণও FIIs-কে ভারতীয় স্টক পুনর্বিবেচনা করতে উৎসাহিত করছে।
🎯 আগামী দিনের বাজারের গতিপথ
ভারী বিক্রয় থেকে সতর্কতামূলক ক্রয়ের দিকে এই FII-এর পরিবর্তন নিঃসন্দেহে বাজারের জন্য একটি ইতিবাচক মোড়। সাতটি সেশনে ₹৩,০০০ কোটির বেশি বিনিয়োগ প্রমাণ করে যে ভারতীয় ইক্যুইটির প্রতি তাদের আগ্রহ পুনরুদ্ধার হয়েছে। ভারত-মার্কিন বাণিজ্য আলোচনা এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক সূচক অনুকূল থাকলে, এই নতুন প্রবণতা আরও বৃহত্তর বিদেশী পুঁজির প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। অক্টোবর ২০২৫ ভারতীয় শেয়ার বাজারের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করেছে।