পাহাড়ের রাজনীতিতে বসন্তের হাওয়া নয়, বরং বইছে তীব্র নির্বাচনী উত্তাপ। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দার্জিলিং, কালিম্পং এবং কার্শিয়াং—এই তিন মহকুমায় এখন সাজ সাজ রব। তবে এবারের লড়াইটা কেবল সমতলের রাজনৈতিক দলগুলোর নয়, বরং পাহাড়ের তিন হেভিওয়েট নেতার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। অনিত থাপা, বিমল গুরুং এবং অজয় এডওয়ার্ডস—এই তিনজনের ত্রিমুখী লড়াইয়ে পাহাড়ের ভোট-অঙ্ক এখন চরম জটিল।
বর্তমানে পাহাড়ের প্রশাসনিক ক্ষমতার রাশ অনিত থাপার হাতে। তাঁর দল ‘ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা’ (BGPM) তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনের ময়দানে নেমেছে। অনিত থাপার মূল অস্ত্র ‘উন্নয়ন ও স্থায়িত্ব’। গত কয়েক বছরে পাহাড়ে জিটিএ-র মাধ্যমে শান্তি বজায় রাখা এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে তিনি ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও পাহাড়ের তিনটি আসন অনিত থাপার দলের জন্যই ছেড়ে দিয়েছেন, যা প্রমাণ করে যে শাসক শিবিরের পূর্ণ আস্থা রয়েছে তাঁর ওপর।
অন্যদিকে, পাহাড়ের রাজনীতির পুরনো চালক বিমল গুরুং আবার নিজের জমি ফিরে পেতে মরিয়া। তাঁর দল ‘গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা’ (GJM) এবার বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। গুরুংয়ের তুরুপের তাস হলো ‘গোর্খা পরিচিতি’ এবং ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান’। বিমলের দাবি, পাহাড়ে উন্নয়ন হলেও গোর্খাদের মূল দাবি অবহেলিত। বিজেপি এবং বিমল গুরুংয়ের এই জোট মূলত পরিচয় রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে পাহাড়ের মানুষের আবেগ উস্কে দিতে চাইছে।
তবে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হতে পারেন অজয় এডওয়ার্ডস। তাঁর দল ‘ইন্ডিয়ান গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্ট’ (IGJF) বা হামরো পার্টি এবার কেবল পাহাড়েই সীমাবদ্ধ নেই। পাহাড়ের তিন আসনের পাশাপাশি সমতলের শিলিগুড়ি বা সংলগ্ন এলাকাতেও তাঁরা প্রার্থী ঘোষণা করে চমক দিয়েছেন। অজয় এডওয়ার্ডস নিজেকে ‘বিকল্প শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরছেন, যাঁর লক্ষ্য দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং পাহাড়ের মানুষের প্রকৃত অধিকার।
পাহাড়ের মানুষের কাছে একদিকে রয়েছে অনিত থাপার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে বিমল গুরুংয়ের গোর্খাল্যান্ডের আবেগ এবং অজয় এডওয়ার্ডসের নতুন ধারার রাজনীতি। সমতলে প্রার্থী দেওয়া অজয়ের এই কৌশল আদতে পাহাড়ের বাইরে থাকা গোর্খা ভোট ব্যাংককে একজোট করার প্রয়াস বলেই মনে করা হচ্ছে। এই ত্রিমুখী সংঘর্ষে শেষ পর্যন্ত পাহাড় কার দিকে ঝোঁকে, তার ওপরই নির্ভর করছে উত্তরবঙ্গের রাজনীতির ভবিষ্যৎ।